একজন ইলা মিত্র ও কৃষকের মুক্তি সংগ্রাম [ বর্ষ-৯, সংখ্যা-৩১]

নৃ- কল্প; থিয়েটার বিষয়ক ভাঁজপত্র

প্রকাশনায় : নৃ- নাট্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

 প্রথম প্রকাশ : ১৩ মার্চ, ২০১২

বাংলার কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ইলা মিত্রের নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস কখনো ভোলার নয়। জমিদার পুত্রবধূ ইলা মিত্র তাঁর সামাজিক অবস্থানকে তুচ্ছ করে তেভাগা আন্দোলনে দরিদ্র, অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, হয়েছিলেন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার।
ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার কৃষকদের উপর শোষণ ও নির্যাতন চূড়ান্ত মাত্রা লাভ করে। ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ আইনের মধ্য দিয়ে কৃষকের জমির মালিকানা চলে যায় জমিদারদের হাতে। মধ্যস্বত্বভোগী জোতদারের কাছ থেকে জমি ইজারা নিতে হত। নিজ খরচ ও শ্রমে উৎপাদিত ফসলের অর্ধেক বা তারও বেশি খাজনা হিসেবে কেটে নিত মহাজন। এছাড়াও শোষণের আরো মাধ্যম ছিল- আধি প্রথা, ধানুয়া খাজনা বা টংক প্রথা, নানকার বা গোলামি প্রথা, মহাজনি প্রথা, তোলা (৫ সের চালে ১ সের বা তারও বেশি পরিমাণ চাল), লেখাই (গরুপ্রতি ২ টাকা, মহিষ প্রতি ৪ টাকা) ইত্যাদি। উৎপাদিত ফসলের যে সামান্য অংশটুকু কৃষকের ঘরে উঠতো তাতে বড়জোড় তিনমাস চলতো সংসার।


এই ভয়াবহ দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে বহু কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৬ এ শুরু হওয়া তেভাগা আন্দোলন ছিলো সকল জাতি-ধর্মের কৃষকের সংঘবদ্ধ আন্দোলন; যার সূত্রপাত ঘটে দিনাজপুরে কমরেড হাজী দানেশের হাত ধরে। এই আন্দোলের দাবি ছিলো উৎপাদিত ফসলের দুই ভাগ নেবে কৃষক, বাকি এক ভাগ যাবে খাজনা হিসেবে। দ্রুতই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ইলা মিত্র ১৯৪৭ সালে রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলের নাঁচোলে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। হয়ে ওঠেন নিপীড়িত মানুষের ‘রাণীমা’। দিনে দিনে আন্দোলন আরো বড় রূপ নিতে থাকে।


বিয়ের আগে ইলা মিত্রের নাম ছিলো ইলা সেন। তিনি ১৯২৫ সালের ১৮ অক্টোবর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারের আদি নিবাস তৎকালীন যশোর জেলার ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীন বাংলার একাউনটেন্ট জেনারেল। পিতার চাকরিসূত্রে বেড়ে ওঠা কলকাতায়। পড়েছেন কলকাতার বেথুন স্কুল ও বেথুন কলেজে। বেথুন কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। একই বিষয়ে পরবর্তীতে ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি খেলাধুলা, গান ও অভিনয়ে পারদর্শী ছিলেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন রাজ্য সরকারের জুনিয়র এথলেটিক চ্যাম্পিয়ন। তিনিই প্রথম বাঙালি মেয়ে হিসেবে ১৯৪০ সালে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ এর জন্য নির্বাচিত হন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সে বছরে জাপানের অলিম্পিক আসরটি বাতিল হয়ে যায়।
১৯৪৩ সালে বেথুন কলেজে স্নাতক পড়াকালীন সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইলা মিত্র। ‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ -র বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি মাত্র আঠারো বছর বয়সে ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি’-র সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪৫ সালে দেশকর্মী কমিউনিস্ট রমেন্দ্র মিত্রের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। রমেন্দ্র মিত্রের বাবা মহিমচন্দ্র মিত্র ছিলেন মালদহের নবাবগঞ্জ থানার রামচন্দ্রপুর হাটের জমিদার। বিয়ের পর ইলা মিত্র স্বামীর সাথে শ্বশুরবাড়িতে চলে আসেন। হিন্দু রক্ষণশীল পরিবার হওয়ায় প্রথমদিকে তিনি অন্দরমহলেই থাকতেন। পরে শ্বশুরবাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুরে রমেন্দ্র মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল বানানো হয়। গ্রামবাসীর অনুরোধে সেখানে পড়ানোর অনুমতি পেয়ে যান ইলা মিত্র। তাঁর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় মাত্র তিন মাসে তিন (০৩) জন শিক্ষার্থী নিয়ে শুরু করা স্কুলের ছাত্রী সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় পঞ্চাশ (৫০) এ। এর মধ্য দিয়ে গ্রামবাসীর কাছে ইলা মিত্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। ১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা হলে তিনি পার্টির কর্মী হিসেবে নোয়াখালীর হাসনাবাদে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসন ও সেবার কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হলে মিত্র পরিবারের জমিদারি অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহীর অন্তর্ভুক্ত হয়। পাকিস্তান হওয়ার পরও তেভাগা আন্দোলন চলতে থাকে। পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক স্থানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন হয়। কমরেড ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্রের পৃথক নেতৃত্বে নাঁচোল ও তার আশপাশের অঞ্চলে শুরু হয় এক নতুন আন্দোলন। ১৯৪৮ সালে অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান প্রসবের জন্য ইলা মিত্র গোপনে কলকাতায় যান। পুত্র সন্তান জন্মের মাসখানেকের মধ্যে ফিরে আসেন নাঁচোলে। ১৯৪৯ সালে তাদের নেতৃত্বে হাজার হাজার ভূমিহীন কৃষক সংগঠিত হয়ে রুখে দাঁড়ালে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে জোতদার, মহাজনদের দল। ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর পুলিশ বাহিনীর তিনজন কনস্টেবল ও একজন দারোগা আন্দোলন বানচালের উদ্দেশ্যে নাঁচোলের চণ্ডিপুর-কেন্দুয়া অঞ্চলে যায়। ভয়ভীতি দেখাতে গুলি ছুড়ে, কিন্তু সেই পুলিশ বাহিনী বুঝতে পারেনি আন্দোলনরত কৃষকরা সংঘবদ্ধ রয়েছে। পুলিশের ছোড়া গুলিতে জনৈক সাঁওতাল ভাগচাষী নিহত হলে সাথে সাথে চারদিক থেকে মাতলা মাঝির নেতৃত্বে থাকা সাঁওতাল কৃষকরা তীর নিক্ষেপ করা শুরু করলে পুলিশের দারোগাসহ তিন কনস্টেবল সেই স্থানেই নিহত হয়। নিহতের খবরটি পুলিশের বহনকারী গরুর গাড়ির চালক লালুনাথ কর্মকার পালিয়ে থানায় জানালে দ্রুততম সময়ে নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে পুলিশ এসে নাঁচোলের সাঁওতাল ও ভাগচাষি হিন্দু-মুসলমানদের ওপর পাশবিক অত্যাচার করে। ঘটনার পরপরই রমেন মিত্র ও মাতলা মাঝি কিছু আন্দোলনকারীদের নিয়ে ভারতে চলে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি ইলা মিত্র রহনপুর স্টেশনের কাছে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।


জেলে তাঁর উপর অসহনীয় শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। জবানবন্দিতে তিনি বলেন —‘সেলের মধ্যে আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে নির্যাতন করা হয়নি। ১৯৫০ সালের ১০ জানুয়ারি যখন জ্ঞান ফিরে এলো তখন আমি দেখলাম আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরছে। রক্তে কাপড়-চোপড় ভিজে গেছে। এরপর আমাকে নবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠাল। ১৯৫০ সালের ২১ জানুয়ারি নবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে এসে সেখানকার জেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তবুও আমি পুলিশকে কিছুই বলতে রাজি হইনি।’ অবশেষে ১৯৫১ সালের ১৬ মে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করে নতুন আইন পাশ হয়।


১৯৫৩ সালে ইলা মিত্রকে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৫২ সালের পর ঢাকার অবস্থা অস্থিতিশীল হতে থাকে। কমরেড ইলা মিত্র ও তার সহযোদ্ধাদের কীর্তি তখন ছাত্র জনতার চোখে অত্যন্ত সম্মানের। সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জোরদার হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নির্দেশে ইলা মিত্রকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি কলকাতায় চলে যান। সুস্থ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন ১৯৮৯ সালে। শিক্ষকতার পাশাপাশি ইলা মিত্র পশ্চিমবঙ্গের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য কাজ করেছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির জেলা ও প্রাদেশিক কমিটির সদস্য ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন আন্দোলনের জন্য তিনি ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৭১ ও ১৯৭২ সালে কারাবরণ করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর বিশেষ আত্মিক সম্পর্ক ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বাংলাদেশের শরণার্থীদের অক্লান্তভাবে সেবা করেছেন।


ইলা মিত্রের অনুদিত কয়েকটি রুশ গ্রন্থ হচ্ছে ‘জেলখানার চিঠি’, ‘হিরোশিমার মেয়ে’, ‘মনে প্রাণে’, ‘লেনিনের জীবনী’ ও ‘রাশিয়ার ছোট গল্প’। হিরোশিমার মেয়ে বইটির জন্য তিনি ‘সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু’ পুরস্কার লাভ করেন। অ্যাথলেটিক অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরস্কার পান। এ ছাড়াও ভারত সরকার তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বতন্ত্র সৈনিক সম্মানে ‘তাম্রপত্র’ পদকে ভূষিত করেন।


ইলা মিত্র জমিদার পুত্রবধূ হয়েও নিষ্পেষিত নাঁচোলের কৃষকদের স্বার্থে জীবনের যাবতীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করেন। এই আত্মত্যাগের প্রতিদান হিসেবে তিনি আজও নাঁচোলবাসীর কাছে ‘রাণীমা’ হয়ে আছেন। ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর এই মহীয়সী নারী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সংগ্রামী জীবন গাঁথা কালে কালে অসহায় শোষিত জনগোষ্ঠীকে মুক্তির অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s