মহাশ্বেতা দেবী

“মানুষ হিসেবে আমার একটা নিজস্ব বিশ্বাস আছে। সেটা আমার দেখা বৈষম্য, নির্যাতন, যুদ্ধ, ধনীদের তৈরি দুর্ভিক্ষ, নিচু বর্গের মানুষকে উচ্ছেদ এবং অবর্ণনীয় অত্যাচার—এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আমার কাছে ধর্মবিশ্বাসের মতো। একজন লেখক হয়ে কী করে বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আমি উপেক্ষা করব, এ আমার চরিত্রে নেই। আমি যা করি তা জীবনের বাস্তব চরিত্রদের নিয়েই, ওদের গল্পই রক্তমাংসের মত আমার লেখায় স্থান পায়।”- মহাশ্বেতা দেবী।


মহাশ্বেতা দেবী একজন  বিশিষ্ট সাহিত্যিক, কূটনীতিবিদ ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী।তিনি প্রতিবাদী জীবন ও সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র ঘরানার লেখক। তিনি একজন  অনুসন্ধানী লেখক হওয়ায় তাঁর লেখায় বহুমাত্রিক অনুষঙ্গে দেশজ আখ্যান উপস্থাপিত হয়েছে এবং বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে বিভিন্ন আদিবাসী এবং মেয়েদের উপর শোষণ এবং বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছেন। মহাশ্বেতা দেবীর জন্ম ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, ঢাকায়। তাঁর পিতা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও মা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন সাহিত্যিক ও সমাজসেবী।তাঁর কাকা ছিলেন বিখ্যাত চিত্রপরিচালক ঋত্বিক ঘটক। ছোট বেলা থেকেই এমন সাহিত্য ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বেড়ে ওঠার কারণে তার মধ্যে সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ ঘটে। ১৯৪৩ সালে পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় তিনি আশুতোষ কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী থাকাকালে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রী সংগঠন ‘ গার্লস স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ দুর্ভিক্ষকালীন ত্রাণ কাজে আত্মনিয়োগ করেন।এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মহাশ্বেতা দেবীকে প্রথম আবিষ্কার করা যায় একজন রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্ট হিসেবে। তিনি কমিউনিস্ট পার্টির মিটিংয়ে যোগ দিতেন, পার্টির মুখপত্র ‘জনযুদ্ধ’ বিক্রি করতেন এবং সেই পত্রিকার নিয়মিত পাঠকও ছিলেন। তিনি সরাসরি পার্টির সদস্য না হয়েও কাজ করে যেতেন এবং সেভাবেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মূলত তখন থেকেই তাঁর কর্মিসত্তার বিকাশ, যা পরবর্তীকালে আরো বিকশিত হয়। 
তিনি বিশেষ কোনো গণ্ডিতে আটকে থাকেননি। চাকরিবাকরি করেছেন, কিন্তু তাঁর কমিউনিস্ট মনোভাবের জন্য আবার সেসব ছেড়েছেন; বিতাড়িতও হয়েছেন। মহাশ্বেতা দেবী একটি ডাকঘরে চাকরি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁর কমিউনিস্ট মনোভাবের জন্য তাঁকে সেখান থেকে বিতাড়িত করা হয়। ১৯৬৪ সালে মহাশ্বেতা দেবী ভারতের বিজয়গড় কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেই সময় বিজয়গড় কলেজ ছিল শ্রমিক শ্রেণির ছাত্রীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই সময় মহাশ্বেতা দেবী একজন সাংবাদিক ও একজন সৃজনশীল লেখক হিসেবেও কাজ চালিয়ে যান। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোধা ও শবর উপজাতি, নারী ও দলিতদের নিয়ে পড়াশোনা করেন। তাঁর প্রসারিত কথাসাহিত্যে তিনি প্রায়শই ক্ষমতাশালী জমিদার, মহাজন ও দুর্নীতিগ্রস্থ সরকারি আধিকারিকদের হাতে উপজাতি ও অস্পৃশ্য সমাজের অকথ্য নির্যাতনের চিত্র অঙ্কন করেছেন।


প্রকৃত সৃষ্টিশীল লেখকের কোনো ধর্ম থাকে না। মানবমুক্তিই তার ধর্ম। যারা রাষ্ট্রের দ্বারা বা উচ্চশ্রেণির মাধ্যমে ক্রমাগত নানা নির্যাতনের মধ্যে পড়ে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না, তাদেরকথাই তিনি লিখেছেন। সমাজের বিচিত্র চরিত্রগুলোকে আবিষ্কার করা এবং তার মধ্যে অনুপ্রবেশ করা লেখকের কাজ। তিনি যেমন ইতিহাস থেকে চরিত্র নিয়ে উপন্যাস রচনা করেন, তেমনি তাঁর রচিত উপন্যাসের চরিত্ররা যেন ইতিহাস হয়ে যায়। এক্ষেত্রে আমরা স্মরণ করতে পারি ‘অরণ্যের অধিকার’ উপন্যাসটির কথা। এই উপন্যাসের নায়ক বীরসা মুণ্ডাকে মহাশ্বেতা দেবী এনেছেন ভারতীয় দলিত সংগ্রামের ইতিহাস থেকে। মুণ্ডা বিদ্রোহের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাসটি যেমন ঐতিহাসিক উপন্যাস, তেমনই এটি একটি রাজনৈতিক উপন্যাসও।

ঔপনিবেশিক যুগে শুধু নয়, কালে কালে উচ্চবর্ণের দ্বারা শোষিত মানুষদের অধিকারের লড়াই এর ইতিহাস রয়েছে এই উপন্যাসে।উপন্যাসটি  শুরুই হচ্ছে একটি জেলখানার মধ্যে মুমূর্ষু একজন ব্যক্তির আর্তনাদের আর্তস্বরের মাধ্যমে। তার জীবন শুরু অরণ্য থেকে এরপর শিক্ষা গ্রহণের নিমিত্তে মিশনে ভর্তি, সেখান থেকে আস্তে আস্তে বিপ্লবী ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠা এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নির্যাতিত আদিবাসীদের ভগবানে রূপ নেওয়া। এরপর বীরসার ফাঁসির হুকুম। সব মিলিয়ে রিমান্ডে বীরসার মৃত্যু। এই উপন্যাসটির কেন্দ্রবিন্দু অরণ্য। অরণ্যে বসবাস এবং একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রভাবশালীর মধ্যে মুন্ডা জনগোষ্ঠীর যে প্রতিবাদ এবং সংগ্রাম সেটি চিত্রায়িত করেছেন মহাশ্বেতা দেবী। মুন্ডা জনগণ ধর্মান্তরিত হয়েছে ক্ষুধার দায়ে, কিন্তু লাভ হয়নি। কারণ তারা যে বিদ্রোহটা করতে চেয়েছিল এবং যে অধিকার নিয়ে তাদের চিরদিনের পীড়ন সেটা চূড়ান্তরূপ লাভ করে নাই। তাই আবার নিজের ধর্মে, নিজের সংস্কৃতিতে ফিরে এসেছে। কারণ স্বভাষায়, স্বজাতীয় সংস্কৃতিতে যেকোনো বিষয় যতটা খুব গভীর এবং যৌক্তিক ভাবে ফুটিয়ে তোলা যায় ততটা অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে বা অন্য ভাষায় সেটা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এই বিখ্যাত উপন্যাস এর জন্য ১৯৭৯ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।


মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন দেশজ আখ্যান ও প্রান্তিকবাসীর দরদি মানুষ। নকশালবাড়ি আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন ‘হাজার চুরাশির মা’ । এই উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে তৎকালীন ধনিক শ্রেণীর মানুষের জীবনব্যবস্থা, যাদের কাজ গরীবদের শোষণ করে টাকার পাহাড় তৈরি করা।আর এই বিকৃত ধনিক শ্রেণীকে নির্মূল করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য নকশাল আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। এই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সমাজের বুর্জোয়া শ্রেণীকে নির্মূল করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। এই আন্দোলনে অংশ নেয় ব্রতী নামের এক যুবক যার মৃত্যু হয় পুলিশের গুলিতে। বাঙালির কপালে ভাঁজপড়া শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনবোধের সামান্য মূল্যবোধ ভেঙে সুজাতা নামের এক নারীকে ওপরে তুলে আনেন লেখিকা।  মধ্যবিত্ত বাঙালি মায়ের নকশাল করা ছেলেটিকে হারানোর যে বেদনা, সেই বেদনার মধ্য দিয়েই ক্রমশ রাজনৈতিক হয়ে উঠেছিল উপন্যাসটি। প্রদর্শিত হয়েছে কিছু স্বার্থবাদী মানুষের চরিত্র। যাদের আত্মস্বার্থের বলি হতে হয় অনেককে। মূলত ‘হাজার চুরাশির মা’ তাঁর সাহিত্যজীবনে আরো একটি বাঁক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। জীবন-দর্শনের এক মহাঅধ্যায়ের সূচনা করেন তিনি।মহাশ্বেতা দেবীর মতে তার লেখা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয় ‘চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর’ বাংলাদেশের খ্যাতনামা পত্রিকা বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়েছিল।এই উপন্যাসে ওখানকার বাসিন্দাদের জীবন সংগ্রামের কথা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে বিস্তারিত আঙ্গিকে তুলে ধরেন।
তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য শালগিরার ডাকে, ইটের পরে ইট,হরিরাম মাহাতো’, বসাই টুডু , মাস্টার সাব, অক্লান্ত কৌরব , সুরজ গাগরাই , টেরোড্যাকটিল, পূরণ সহায় ও পিরথা, প্রথম পাঠ , ক্ষুধা, দ্রৌপদী ,সিধু কানুর ডাকে ইত্যাদি। এ সব গল্প উপন্যাসে তিনি সাম্রাজ্যবাদী  ও এদেশীয় সামন্ততান্ত্রিক শক্তির শোষণের চিত্রের সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে  প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন।মহাশ্বেতা দেবী বেশ কিছু সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনেও অংশগ্রহণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে বিজ্ঞজনদের মধ্যে তিনি প্রথম সারিতে ছিলেন। তিনি কৃষকদের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে উর্বর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে তা অত্যন্ত স্বল্পমূল্যে শিল্পপতিদের দিয়ে দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। নন্দীগ্রাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণ নীতির বিরুদ্ধে বহুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, লেখক ও নাট্যকর্মীকে একত্রিত করেন। শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখতেন মহাশ্বেতা দেবী। আজীবন সংগ্রামী চিন্তা চর্চা করেছেন এবং দেশ ও মানুষ সব ধরনের শোষণমুক্ত হবে সেই লক্ষ্যে সাহিত্য রচনা করেছেন। তিনি সরাসরি সে আদর্শ লালন করতেন, যে আদর্শের ছবি পাওয়া যায় তার সাহিত্য ও জীবনচর্চায়। ভৌগলিক ও ভারতীয় রাজনীতির পরিবর্তনের ধারায় আদিবাসী জীবনের পরিবর্তনকে তুলে ধরেছেন।


পরিশেষে বলতে হয় আপনি যদি উচ্চমানের সাহিত্যকর্মের প্রত্যাশা করেন, উন্নত জীবনবোধের তাড়না থাকে হৃদয়ে তাহলে ১৯২৬ এর মকরসংক্রান্তিতে জন্ম নেয়া থেকে শুরু করে ২০১৬ এর বৃহস্পতিবার অপরাহ্ন পর্যন্ত এই ৯১ বছরে আপনাকে স্বাগতম।তিনি চিরকাল স্বরণীয় হয়ে থাকব তার রচনায়। ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s