রবার্ট ম্যাকনামারা: ইতিহাসের প্রায় অনুচ্চারিত এক ঘাতকের গল্প

mcnamara_650.1

পর্ব-১

 

পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কালপ্রিটগুলোর একজন রবার্ট ম্যাকনামারা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় লোকটা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (১৯৬১-৬৮) দায়িত্ব পালন করছিল। আঁত্কা গুলি খেয়ে মরে হিরো বনে যাওয়া কেনেডি তার প্রশাসনের সবচেয়ে দামি লোক হিসেবে বিবেচনা করতেন ম্যাকনামারাকে।

মার্কিন প্রশাসন তখন নগ্ন। কালা আদমিদের দমিয়ে রাখতে জে এডগার হুভারের তত্ত্বাবধানে এফবিআই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে কোকেইন, হেরোইনের মতো মারাত্মক সব নেশা। সারা দুনিয়ায় একের পর এক ঘৃণ্য প্রজেক্ট নিচ্ছে সিআইএ। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনীদের বর্বরতাও তখন চুড়ান্তে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এই নগ্ন প্রশাসনের অন্যতম কর্ণধার জে এফ কেনেডি এখন মার্কিনীদের কাছে রীতিমতো হিরো। ইতিহাসের আসল ভিলেনদের হিরো হতে খুব বেশি কিছু লাগে না। ঘাতকের বুলেটই যথেষ্ট।

যাই হোক, ছিলাম ম্যাকনামারা প্রসঙ্গে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সাথে ম্যাকনামারার সম্পর্কটা কান আর মাথার মতো। একটাকে টানলে আরেকটা আসবেই। আসতেই হবে। ভিয়েতনামে রাতারাতি আমেরিকার সৈন্যসামন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার পাশাপাশি আর্টিলারি, বোমা বর্ষণ আর রাসায়নিক অস্ত্রের সবচেয়ে এফেক্টিভ ও এফিশিয়েন্ট ইউজ কিভাবে করতে হবে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে সেটা অ্যানালাইসিস করা, অ্যাকশনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ ও সে অনুযায়ী পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণের দায়িত্বটা ছিল ম্যাকনামারার। আর জাত অ্যানালিস্ট হিসেবে ম্যাকনামারা এ দায়িত্ব কতটা কার্যকারিতা ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করেছেন, সেটা ইতিহাসই বলে দিচ্ছে। ভিয়েতনাম-লাওসে মার্কিন সৈন্যরা মূলত ম্যাকনামারার পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করেছেন। তাদের সেসব বর্বরতার প্রচুর ঐতিহাসিক নিদর্শন এখনো জনসমক্ষে উপস্থিত। প্রতিটি বোমা বর্ষণের ঘটনা ছিলো আসলে ম্যাকনামারার পরিকল্পনারই বাস্তবায়ন।

তবু বিধি বাম, ম্যাকনামারার ডেফলিয়েন্টস (রাসায়নিক অস্ত্র), বম্বস অ্যান্ড ক্যানোনস ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিনীদের হার ঠেকাতে পারেনি।

মজার ব্যাপার হলো, ভিয়েতনাম যুদ্ধে সম্মুখ কোনো সমরেই আমেরিকানদের পরাজয় ঘটেনি। তারপরেও তারা যুদ্ধে হেরে গেছে। হেরে গেছে রাজনৈতিকভাবে। হেরে গেছে ভিয়েতনামী ও মার্কিনী জনগণের নৈতিক প্রতিরোধের কাছে। হেরে গেছে কিলিং মেশিন হিসেবে গড়ে তোলা সৈন্যদের নৈতিক মনোবলের অভাবে। বর্বরতা চালাতে গিয়ে তারা ভিয়েতনামী জনগণের কাছ থেকে পদে পদে বাধা আর ঘৃণা আদায় করে নিয়েছে, তেমনি হারিয়েছে নিজ দেশের জনগণের সমর্থনও। খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এ যুদ্ধের প্রতিবাদে প্রতিদিন রাস্তায় নেমেছে মানুষ। প্রতিবাদ হয়েছে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই।

শীর্ষ অ্যানালিস্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে যুদ্ধে আমেরিকার খুব একটা সুবিধা করে উঠতে না পারার কারণগুলো বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব পড়ে রবার্ট ম্যাকনামারার ওপর। রিপোর্টে ম্যাকনামারা সাহেব ভবিষ্যতের জন্য যুগান্তকারী কিছু সুপারিশও দেন। প্রস্তাবনায় মার্কিনী তত্ত্বাবধানে নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবায়নের জন্য অনুন্নত দেশগুলোর সেবা খাতে ক্ষুদ্র পর্যায়ে কল্যাণমূলক (!) সাহায্য সহযোগিতা দেয়ার ধারণা তুলে ধরেন তিনি। ম্যাকনামারার দেয়া এ নতুন ধারণা অনুযায়ী, এতদিন পর্যন্ত মার্কিন মুলুক থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঋণসহ যেসব সহায়তা দেয়া হচ্ছিল, সেগুলো তো বজায় থাকবেই; সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুদ্র অর্থাৎ ব্যক্তি পর্যায়ও ঋণের ধারণা তুলে আনেন তিনি।

আমাদের দেশে অনেকেই ভুলবশত ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে ক্ষুদ্র ঋণের জনক বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণ ধারণাটির প্রকৃত জনক আসলে রবার্ট ম্যাকনামারা। ড. মুহাম্মদ ইউনুস বাংলাদেশে এর কার্যকর প্রয়োগের একটি উদাহরণ তৈরি করেছেন মাত্র। এর সঙ্গে লবিংয়েরও জোর ছিল। ফলে নোবেল বাগাতে তার খুব একটা বেগ পেতে হয়নি।

 

download

 

যাই হোক, ফিরে আসি ম্যাকনামারা প্রসঙ্গে। ক্ষুদ্র ঋণ সম্পর্কিত নতুন এ ধারণা বাস্তবায়নের নিমিত্তেই ১৯৬৮ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ পেলেন ম্যাকনামারা। পরে ১৯৭৩ সালে বিশ্বব্যাংকের পরিচালকমণ্ডলীর সভায় নাইরোবিতে তার ভাষণে এই অবকাঠামোর রূপরেখা ঘোষণা করেন। ম্যাকনামারার সাথে সেদিন বিশ্বব্যাংক ও এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এই প্রস্তাব সমর্থন ও এর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। বলা যায়, রবার্ট ম্যাকনামারাই ক্ষুদ্র ঋণ ধারণার মূল পরিকল্পক। এ ধারণার প্রয়োগের মধ্য দিয়েই শুরু হয় করপোরেটোক্রেসির নয়া অধ্যায় এনজিওবাজির স্বর্ণযুগ।

এই এনজিওবাজদের সমন্বয়কারী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঘাতক সফল শোষকদের জন্য খুলে দেয়া হয় নাইট উপাধি, ম্যাগসেসাইসহ অন্যান্য ‘প্রেস্টিজিয়াস’ পুরস্কারের দরজা। কেউ কেউ বাগিয়ে নেয় নোবেলও। উদাহরণগুলো আমাদের বাংলাদেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সগৌরবে।

এবার ফিরে আসি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ম্যাকনামারা সাহেবের গুরুত্বটা কোথায়। উত্তাল ষাটের দশকে মুক্তিকামী মানুষেরা আলোড়ন তোলে গোটা বিশ্বে। এমনকি আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের মূল ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজ দেশের পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায়। প্রমাদ গোণে করপোরেট সাম্রাজ্যবাদের ধ্বজাধারীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাপক কর্মসূচী হাতে নেয় তারা। এসব কর্মসূচীর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশে দেশে গণমানুষের বিপ্লবী চেতনাকে নস্যাৎ করা, শ্রমজীবীদের একই কাতারভুক্ত হওয়ায় পথে বাধা সৃষ্টি ও কমিউনিস্টবিরোধী ব্যাপক প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে মানুষের চেতনাকে বিভ্রান্ত করে রাখা। একই সঙ্গে নেয়া হয় ধর্মীয় উগ্রবাদে উস্কানি এবং ব্যাপক বিরাজনীতিকীকরণের কৌশল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে ক্যুদেতার ক্ষমতাগ্রহণের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। জনভিত্তি না থাকায় রাজনৈতিকভাবে অবৈধ সামরিক সরকারগুলো প্রায় ফিকে হয়ে আসা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিজেদের সখ্য বাড়িয়ে তোলে।

পাশাপাশি গ্রহণ করা হয় এসব দেশের গ্রামীণ জনগণকে ক্ষুদ্রঋণের দুষ্টচক্রে আটকে ফেলার কার্যক্রম। বিষয়টিকে সাজানো হয় এমনভাবে, যাতে করে দরিদ্র গ্রাম্য জনগণ আর এ জাল কেটে সে আর বেরিয়ে আসতে না পারে। ম্যাকনামারার বস কেনেডির এক নির্বাহী আদেশে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি বা ইউএসএইড) গড়ে তোলা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। ভবিষ্যতে আমরা এ ইউএসএইডকে দেখতে পাবো ম্যাকনামারার ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচীর বাস্তবায়নের অগ্রদূত প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s