স্মৃতির ঝাঁপি


পর্ব – ০৬

থিয়েটারওয়ালাদের সাধনা

এবং

‘মান্যবর ভুল করছেন’


সোনাডাঙ্গার সেই ঝামেলায় অপরাজনৈতিক শক্তিগুলো যে পরের দিন দুপুরে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল; ঠিক তা নয়। ওদের উপস্থিতি আমরা শুরু থেকেই টের পাচ্ছিলাম। রাতের বেলায় ০৩ ব্যাচের ভাইরা যখন আমাদের ফেরানোর চেষ্টা করছিল, সে সময়েই ওই সব শক্তির প্রতিভূদের পোলাপানদের সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উত্তেজিত করার একটা চেষ্টা দেখা গেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে গালিগালাজ করতে গিয়ে যখন তারা দেখলো, সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গাগুলোতেও এসব সাংস্কৃতিক সংগঠনের পোলাপানেরাই আগে, তখন তারা চুপসে গেলো। এর পর ভোরবেলায় আমি ঘুমুতে যাওয়ার আগেও দেখেছিলাম, ওদের কয়েকজন এখানে-ওখানে জটলা পাকানোর চেষ্টা করছে। আমাদের একটা অব্যর্থ কৌশল ছিল জটলা পাকাতে দেখলেই ওদের জটলায় দাঁড়িয়ে পড়ে ফ্লোর কেড়ে নেয়া। তখন তারা আর খুব একটা সুবিধা করতে পারতো না। এটা সেদিন নেয়া কোনো কৌশল ছিল না। এটা আগে থেকেই প্র্যাকটিস করা হচ্ছিল। বিশেষ করে আনরেস্টগুলোর সময়ে। আর এখানে ওখানে চিৎকার চেঁচামেচি করে অহেতুক উত্তেজনা তৈরির মাধ্যমে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে দেয়ার একটা প্রচেষ্টা তো ছিলই। কিন্তু সেখানেও তারা খুব একটা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। কারণ পোলাপানের কাছে তাদের কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না।

দুপুরে অপশক্তিগুলোর নামকরা ও চিহ্নিত প্রতিভূদের একজনকে দেখা গেল ক্যাম্পাসে। তাকে দেখামাত্রই সবাই সতর্ক হয়ে গেল। ০৩ ব্যাচের কয়েকজন ভাই এ সময় তাকে ঘিরে ধরে শুরু করলো আগড়ম-বাগড়ম আলাপ। আলতু-ফালতু কথা বলে তাকে ব্যস্ত রাখার কাজটি সেদিন তারা ভালোভাবেই করেছিল।

এর পর যখন হল ভ্যাকেন্ট করে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল; ধরতে গেলে আমাদের অনেকেই হাঁফ ছেড়েছিলাম। কারণ এক সাথে এতো দিকে খেয়াল রাখা মুশকিল ও পরিশ্রমসাধ্য। আবার আরেকটা ভয় ছিল, ক্যাম্পাস চালু হওয়ার পর যদি কাউকে এ ঘটনা নিয়ে শাস্তি দেয়া হয়, তাহলে তা আরেকটা আনরেস্টের জন্ম দেবে। এর পর এ নিয়ে একটা তদন্ত কমিটি হয়েছিল। তদন্ত কমিটিতে আমাদের কয়েকজনকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এবং আমরা আমাদের পয়েন্টে স্ট্রং ছিলাম বলে ঘটনা এর বেশি এগোয়নি , কারো শাস্তিও হয়নি।

যাই হোক, ছুটি শেষে আমরা ফিরে এসে আবার মান্যবর ভুল করছেনের রিহার্সাল শুরু করলাম। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এভাবে বারবার শুরু করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে হারানো খেই ফিরে পেতেই আমাদের সময় লেগে যাচ্ছে। আর আমাদের রিহার্সাল মানে যা-তা রিহার্সাল না। সে সময় আমরা প্রতিদিন রিহার্সাল শুরুর আগে বাচ্যিক নিয়ে কাজ করতাম। স্কেলিং, শ্বাসের ব্যায়াম, মনসংযোগ, শারিরীক স্ট্যামিনা ধরে রাখার জন্য ডায়লগ বলতে বলতে দৌড়ে এসে লাফিয়ে এসে প্রতিবন্ধক পার করা এসব ছিল নিয়মিত। মারুফ ভাইও প্রচুর কাজ করিয়েছেন সে সময়। তবে আমি যেই জিনিষটায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতাম, সেটা হলো টিমওয়ার্ক। বিভিন্ন ধরনের ট্রাস্ট গেম খেলতাম আমরা। পারফরমেন্স ও টিমওয়ার্ক- এ দুটোর সমন্বয়ে একটা সিলেবাসও করেছিলাম আমি আর মারুফ ভাই। এর মধ্যে একদিন ৯৮ ব্যাচের রাজিবদা এলেন রিহার্সাল দেখতে। তিনিও আমাদের সঙ্গে দৌড়ুলেন এবং রিহার্সালে মনযোগী ছাত্রের মতো পার্টিসিপেট করলেন।

যাই হোক, একটা পর্যায়ে আবার ব্যাগড়া রিহার্সালে। আসাদ ভাই তৃতীয় করছিল। ডায়লগ মুখস্ত হলেও তার মধ্যে মনসংযোগের যথেষ্ট ঘাটতি দেখা যাচ্ছিল। কারণ সে সময় তার একটা ক্রিটিকাল প্রজেক্ট চলছে। এবং সেখানে তার পারফরমেন্স খুব একটা ভালো না। ক্লাসে নিয়মিত ধাতানি খাচ্ছে। সব মিলিয়ে তার তখন একটা লেজেগোবরে অবস্থা। এ অবস্থায় শৈবালদা বললেন, বাপ্পী আসাদের বিকল্প ভাব। কারণ ওর প্রজেক্টের অবস্থা খারাপ। রিহার্সাল ফ্লোরেও অবস্থা খারাপ। ওর কোনোটাই এগোচ্ছে না। একই কথা বললেন মারুফ ভাইও। আমি একটু গাঁইগুঁই করলাম। কারণ, এখন আমি তৃতীয় কাকে দাঁড় করাবো? মারুফ ভাই বললেন, তুই-ই কর। তাহলে তৃতীয় পঞ্চমের টিমওয়ার্ক জমবে। অন্যরাও বললো, তাই হোক। কিন্তু আমার পছন্দ ছিল সূত্রধর। কারণ ওখান থেকে ডিরেকশন দেয়া সহজ। যাই হোক, শৈবালদা আর মারুফ ভাইর কথায় শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলাম।

মান্যবর ভুল করছেন নাটকটা নিয়ে আমরা প্রচুর খেটেছিলাম। মারুফ ভাই সিনেমাটা সংগ্রহ করলেন। আমরা দলবেধে এই সিনেমাটা কতবার দেখেছি, তার হিসাব নেই। ডায়লগ আর ব্লকিং নিয়ে আমরা রীতিমতো খেলতাম। একটা উদাহরণ বলা যায়, রাতের বেলা আমি আর মারুফ ভাই ভাত খাওয়ার হাটতে বেরিয়েছি। দেখে মনে হবে আমরা ক্যাম্পাসে হাঁটছি আর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছি। আসলে কিছুই না। আমরা নানাভাবে ডায়লগ থ্রো করে যাচ্ছি। কখনো ধীরলয়ে। কখনো তুফান মেইলের গতিতে। আবার কখনো ভেঙে ভেঙে এক শব্দে। প্রতিটি ব্লকিং নিয়ে ফ্লোরের বাইরেও আলোচনা-পর্যালোচনা হচ্ছে। কোপা তার প্রতিটি মুভমেন্ট নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। মেহরাব ভাইকে দেখা যাচ্ছে অবসর সময়ে স্ক্রিপ্ট নিয়ে রীতিমতো গবেষণা চালাচ্ছে। ব্যতিক্রম ছিল শোভন। ওকে ফ্লোরে যতটুকু করানো হতো, ততটুকুই। ওর ক্যারেক্টারের সত্য ওকে যতটা বোঝানো হতো, ততোটাই। বাইরে তার যাবতীয় আগ্রহ ছিল আমার কাছে এসে সিনিয়রদের নামে বদনাম করায়। নাটক ও টিমের স্বার্থে তখন শুধু শুনছিলাম। শৈবালদাকেও তখনো জানাইনি। আমি ওয়েট করছিলাম, কোনদিন শো হবে, তার পর প্রথমেই ওর ডানা কাটা হবে। এর আগ পর্যন্ত যতদূর যেতে পারে, উড়ুক।

মাঝেমধ্যে রিহার্সালের ফ্লো বা আমাদের উদ্যমে ভাটা পড়লে তপনদার দোকানের পেছনে মারুফ ভাই আমাদের শপথ করাতেন। এসব শপথ বেশ টনিক হিসেবে কাজ করতো।

মারুফ ভাই তখন খাজা ৩০৫-এ থাকতেন। আমি থাকতাম ২০৪-এ। রাতের বেলা হঠাৎ করে দেখা গেল, মারুফ ভাই বারান্দায় এসে ডাক দিচ্ছেন, ‘বাপ্পী! ওপরে আয় তো!’ আমি চলে যেতাম। রুমে ঢুকতে না ঢুকতে মারুফ ভাই একটা ডায়লগ দিচ্ছেন; জবাবে আমি আরেকটা। আবার কখনো কখনো আমি নিজেই চলে যাচ্ছি সেখানে। দেখা গেল, সেখানে গিয়ে নাটকটা নিয়ে নানা জাত-বেজাতের গবেষণা চালাচ্ছি। এমনকি আমাদের হাসি-ঠাট্টা-মশকরা-আকথা-কুকথার মধ্যেও নাটকটা কোনো না কোনোভাবে চলে আসতো।

ততদিনে নৃ-নাট্যে ০৮ ব্যাচের সম্ভাবনাময় কিছু মুখ পেয়েছি আমরা। প্রণয়, মৃদুল, মারুফ, নাবিলা, কৃষ্টি, লিখন, সিনথিয়া, সৌরভ, হিমু, সাথী; মোট ১০জন। এর মধ্যে মৃদুল, সিনথিয়া ও মারুফ এই তিনজনকে আমরা মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি নৃ-নাট্যের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বদাতা হিসেবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এ ১০ জনের কাউকেই শেষ পর্যন্ত আমরা অ্যাক্টিভ রাখতে পারিনি। সে ঘটনাও আসছে শিগগিরই।

আমরা তখন একটা পারফেকশনিস্ট টিম। প্রথমে আমরা শোয়ের ডেট ঠিক করলাম নভেম্বরের শুরুর দিকে। কিন্তু শোয়ের দুইদিন আগে আমাদের মনে হলো, আমাদের আরো সময় নেয়া উচিৎ। এর পর সময় যতো যায় আমাদের কাজের গতি আরো বাড়ে। কিন্তু আমাদের সন্তুষ্টি আসে না। সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে ছিলাম আমি। এই নাটকের স্ক্রিপ্ট যারা দেখেছে, তারা বুঝবে এতে তৃতীয় করে ডিরেকশন দেয়াটা বেশ মুশকিলের কাজ। অন্যদের প্রতিটা মুভমেন্টে নজর রাখতে গিয়ে আমারটা আর মনমতো করতে পারি না। শেষ পর্যন্ত আরো তিন দফায় পেছানোর পর শো হলো ১ ডিসেম্বর (ততোদিনে ফেসবুকের জোর ব্যবহার চালু হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে। টাইমলাইন ঘেঁটে ডেটসহ বলে দেয়া সম্ভব)। সামনে একটা বড় ছুটি বলে আমরা সংগঠনগুলো সেবার বিজয় উৎসবের অনুষ্ঠান একটু এগিয়ে এনে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। অ্যাকাডেমিক প্রেশার তখন নেই বললেই চলে। সেবার সেন্ট্রাল প্রোগ্রাম সমন্বয়ের দায়িত্ব ছিল থিয়েটার নিপুনের।

সেকেন্ড অ্যাকাডেমিকের (লাইফ সায়েন্স) চারতলায় ছিল অডিটোরিয়াম। আগের দিন ফার্স্ট অ্যাকাডেমিকে তিন-চার দফা রান থ্রু দিয়ে এসে দেখতে পেলাম মঞ্চ তৈরি। মৃদুলকে সাথে নিয়ে শৈবালদা সব রেডি করে ফেলেছে। এখন আমি গিয়ে শুধু লাইট বসানো বাকি। লাইট বসিয়ে হলে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত।

পরদিন শোয়ের দিন সকাল থেকেই আমরা একসাথে। লাইট-সেটসহ কয়েক দফা রান থ্রু দিয়ে, দুপুরে অডিটোরিয়ামের সিঁড়িতে এক পশলা ঘুমও দিয়ে নিলাম। বিকেলে উঠে সব ঠিকঠাক করে আমরা নাটকের জন্য রেডি। লোকজন আসা শুরু করলো। আমাদের নাটক দিয়েই শুরু হলো সেন্ট্রাল প্রোগ্রাম। অ্যাংকর দীপ ভাই। মনির স্যার প্রোগ্রামের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন।

এর পর শুরু হলো আমাদের নাটক মান্যবর ভুল করছেন। নাটকে সবার পারফরমেন্সই চোখ ধাঁধানো। কেবল শোভনের পারফরমেন্স স্পষ্ট বলে দিচ্ছিল, শুরু থেকে একটানা রিহার্সাল করার পরেও ও টিমের সাথে মেন্টালি অ্যাটাচড হতে পারেনি। অহেতুক ভুলভালভাবে অন্যের ডায়লগ খেয়ে দিচ্ছিল সে। আমার পারফরমেন্সও খারাপ ছিল না। কিন্তু ডিরেক্টরের টেনশন আমার সাবলীলতাকে কিছুটা ব্যাহত করছিল। এর মধ্য নাটক চলাকালে আমরা একবার এক ধাক্কায় চার-পাঁচ পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। পরে অবশ্য আমি আর মারুফ ভাই আগড়ম-বাগড়ম ডায়লগ দিতে দিতে সেই আগের জায়গায় ফিরিয়ে এনেছিলাম।

সেদিন নৃ-নাট্য খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়কে আবার আরেকবার দেখিয়ে দিয়েছিল নাটক কি করে করতে হয়। কানায় কানায় ভর্তি অডিটোরিয়ামে উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। আমার আর মারুফ ভাইর বোঝাপোড়া, রাকিব ভাইর চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্স, মেহরাব ভাইর ঠিক সময়ে ঠিক রেসপন্স নাটকটাকে নিয়ে গিয়েছিল এক অন্যরকম উচ্চতায়।

আমার মনে আছে, শো শেষ হওয়ার পর আমি স্টেজ থেকে নামা মাত্র আমাকে মনির স্যার, অভি স্যার, মুক্তা ম্যাডামসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক ছেঁকে ধরলেন অভিনন্দন জানানোর জন্য। শিক্ষকদের পর পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই এসে হাত মিলিয়ে গেল। এ অভিনন্দনটুকু পাচ্ছিলাম পারফরমার হিসেবে নয়, নাটকের ডিরেক্টর হিসেবে। সেদিনের বেস্ট পারফরমার ছিল মারুফ ভাই আর কোপা। অন্যদিকে ক্যারেক্টারের কারণেই মঞ্চে মারুফ ভাই আর আমার দ্বন্দ্বটাও জমেছিল বেশ।

‘জাগো বাহো, কুনঠে সবায়’ স্লোগান দিতে দিতে বেরিয়ে এলাম অডিটোরিয়াম থেকে। তখনো ভাবিনি খুবিতে আমাদের সুখের দিনের মেয়াদ আর মাত্র এক বছর।

মান্যবরের প্রথম শোটা ছিল অনেক বড় একটা চ্যালেঞ্জ। এ নাটকের পরের শোগুলোয় আমাকে আর এ নিয়ে খুব একটা হ্যাপা পোহাতে হয়নি। তবে সেগুলো প্রথম শোয়ের মতো এতোটা চোখ ধাঁধানোও ছিলো না।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s