স্মৃতির ঝাঁপি


পর্ব: ৫

মান্যবর ভুল করছেন

সোনাডাঙ্গার উদ্দেশ্যহীন সংঘাত


 

(চতুর্থ পর্ব প্রকাশের প্রায় দেড় বছর পর পঞ্চম পর্ব লিখছি। ব্যস্ততা যেমন ছিল, তেমনি নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয়ের একটা বিষয়ও ছিল। অবশেষে এসব সমস্যাকে কাটিয়ে লিখে ফেললাম স্মৃতির ঝাঁপির পঞ্চম কিস্তি)

২০০৮ সালের স্বাধীনতা দিবসের সেই অনুষ্ঠান আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল অনেকখানি। সাধারণত একটা ভালো শো হলে নৃ-নাট্যের কার্যক্রম সপ্তাহখানেক ঝিমিয়ে পড়তো। সিনিয়ররাই আমাদের চরে বেড়াতে দিতেন। যাতে নবউদ্যমে পরের কাজটা শুরু করা যায়।

এর পরপরই শৈবালদা দায়িত্ব নিলেন নৃ-নাট্যের। খাবা হলে কৌশিকদার রুমে বসে কমিটিটা ফাইনাল করা হলো। এর পর বার্ষিক সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, নতুন নাটক নামাতে হবে। পর পর দুটো নাটক আমরা নামিয়েছি স্বল্প পরিসরের এবং অল্প সময়ের রিহার্সাল নিয়ে। অনেকটা ধর তক্তা মার পেরেক টাইপের তাড়াহুড়ার মধ্য দিয়ে। বিষয়টা নিয়ে গ্রুপে আমরা নিজেরাই নিজেদের আত্মসমালোচনা করলাম। কারণ, একজন নাট্যকর্মীর প্রকৃত বিকাশ ও প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে বড় নাটকে দীর্ঘদিন ধরে রিহার্সালের মধ্য দিয়ে। মঞ্চনাটক সত্যিকার অর্থেই একটি সাধনার জায়গা। পর পর দুটি প্রোডাকশনে আমাদের সেই সাধনার জায়গাটা ছিল অনুপস্থিত। এর আগে ‘তৈল সংকট’ নাটকে আমরা অনেক দিন ধরে রিহার্সাল করেছিলাম বটে, কিন্তু লাইফ সায়েন্সের তৎকালীন ডিনের বদান্যতায় আমাদের পরিশ্রমটা গিয়েছিল বিফলে। আবার নৃ-নাট্যের কুশীলবও বদলে গেছে। এছাড়া নাটকের নির্দেশকও তখন নৃ-নাট্য থেকে অফ হয়ে গেছেন। আমি বা মারুফ ভাই, যেই ডিরেকশন দিক না কেন; আমাদের ডিরেকশনে পুরো সেটআপটাই পুরোপুরি বদলে যেত। সুতরাং যাই করি, নাটকটা আবার নামাতে গেলে আবার শুরু থেকে শুরু করতে হবে। কিন্তু তৈল সংকটের মঞ্চায়ন একবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় মোটামুটি আমাদের সবারই নাটকটার ওপরেই বিতৃষ্ণা ধরে গেছে।

611_1064499686933_4130_n

আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো নতুন নাটক খোঁজার, এবং ‘নূরলদীনের সারা জীবন’ নাটকটাকে একটু মডিফাই করে নৃ-নাট্যের সক্ষমতা অনুযায়ী স্ক্রিপ্ট দাঁড় করানোর। সমস্যা হলো, নূরলদীনের সারা জীবনে কোনোমতেই আমি কুশীলবের সংখ্যা কমাতে পারছিলাম না। কারণ সেটা করতে গেলে নাটকের মূল জায়গাটা আর থাকতো না। অতএব অন্য কোনো নাটকই ভরসা। এমন সময়ে মনে পড়লো ‘মান্যবর ভুল করছেন’-এর কথা।

রেজিন্যাল্ড রোজের টুয়েলভ অ্যাংরি ম্যান নাটকটার অনুবাদ করেছিলেন বিষ্ণু বসু। সেটা নিয়ে হলিউডে সিনেমাও হয়েছিল সম্ভবত ১৯৫০ কি ১৯৫১ সালে। নাটকের শেষ ডায়লগ হিসেবে একটা কবিতা লিখে দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এর পর বিষ্ণু বসুর অনুমতিক্রমে সেটাকে নবনাট্যায়ন করেছিলেন আমি এর আগে ঢাকায় যে গ্রুপটায় (বাঙালী নাট্য সম্প্রদায়) কাজ করতাম, তার দলপ্রধান জসিম উদ্দিন। আমার থিয়েটারে হাতেখড়ি তার হাতেই। তিনি প্রথমে নাটকটাকে নবনাট্যায়ন করে নামিয়ে এনেছিলেন বারো থেকে সাত চরিত্রে। পরে এটাকে আরেকটু মডিফাই করে বানালেন পাঁচ চরিত্রের নাটক। ঢাকায় এর মধ্যেই নাটকটার বেশ কয়েকটি শো-তে আমি নিজেই অভিনয় করেছি। স্ক্রিপ্টও চমৎকার। এটার কথা মনে পড়তেই মনে হলো, আরে! এটাকেই তো আমরা নৃ-নাট্যের কাজে লাগাতে পারি।

স্ক্রিপ্ট জোগাড় করতে চলে এলাম ঢাকায়। এসে দেখি এক বিশ্রি অবস্থা। বাঙালী নাট্য সম্প্রদায়ের কাজকর্ম নেই বললেই চলে। দলপ্রধান জসিম ভাই রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। তাকে খুঁজে বের করলাম। স্ক্রিপ্ট চাইলাম। সমস্যা হলো, পাঁচ ক্যারেক্টারের স্ক্রিপ্টটা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। তার কাছে আছে সাত ক্যারেক্টারের স্ক্রিপ্টটা। সাত দিনের মধ্যে ফেরত দেবার শর্তে সেটাই নিলাম। এর পর একটা খাতা কিনে বাসায় এলাম। পাঁচ ক্যারেক্টারের স্ক্রিপ্টে কার ডায়লগ কোনটা সেটা আমার মনে ছিল। তাই সেভাবেই সেটা কপি করে সাত দিনের মধ্যে স্ক্রিপ্ট ফেরত দিয়ে খুলনা ফিরে এলাম। শুরু হলো ‌’মান্যবর ভুল করছেন’-এর রিহার্সাল।

এর মধ্যে চলে এলো পয়লা বৈশাখ। সেবার আয়োজক ছিলো ০৪ ব্যাচ। যদি আমার ভুল না হয়ে থাকে, এর আগের বছর ০৩-এর আয়োজনের মধ্য দিয়ে খুবিতে প্রথম বড় পরিসরে পয়লা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তবে তাতে ক্যাম্পাসের পোলাপান ছাড়া ভিড়ভাট্টা তেমন একটা ছিলো না। আয়োজন হয়েছিল শহীদ মিনারের মাঠ আর দুই অ্যাকাডেমিক বিল্ডিংয়ের মাঝখানে। সেবার কোনো স্পন্সর ছিলো না। কিন্তু ০৪-এর বার স্পন্সর ছিলো। সম্ভবত অ্যাকটেল (বর্তমান রবি)। এমনকি গ্রামীণ ফোন বা বাংলালিংকও হতে পারে। যাই হোক, সেবার আয়োজন ছিলো বেশ বড় পরিসরের। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রথম প্রোগ্রাম, যেটায় লাখ টাকার বেশি স্পন্সর ছিলো। প্রোগ্রামের দুই দিন আগে রিহার্সাল করে ফিরছি। এমন সময়ে ব্যাড, আর্কি আর বিজিই ০৪-এর কয়েকজন আমাকে ঘিরে ধরলো। দুপুরের প্রোগ্রামে ইউআরপির উজ্জ্বল ভাই আর আর্কির ডনি আপুর অ্যাংকরিং করার কথা। কিন্তু উজ্জ্বল ভাই করবে না। বিকল্প হিসেবে তারা আমাকে চায়। আমি গাঁইগুঁই করলেও, ০৪-এর মারমুখী ভঙ্গিমা দেখে রাজি হয়ে গেলাম।

সেবার পয়লা বৈশাখের প্রোগ্রাম হয়েছিল ভিসির মাঠে। সে এক প্রোগ্রাম বটে। সব ডিসিপ্লিনেই ০৪-এর একটা কমন ব্যাপার ছিল, তারা সবকিছু চায় নিখুঁত। সুতরাং, প্রতিটা আইটেমের ভালোমতো রিহার্সালও হয়েছিল। আমি পড়ে গেলাম বিপদে, আমি জানিই না; কখন কোনটা উঠবে। যাই হোক, প্রোগ্রামের লিস্ট দেখে একটা নিজের মতো স্ক্রিপ্ট করলাম।

অনুষ্ঠানটা হয়েছিলো চমৎকার। সেদিন বেশ মজাও হয়েছিলো। খুলনায় কোনো প্রোগ্রামে এর আগে এতো ভিড় হয়েছিল কিনা জানি না। মানুষ হয়েছিলো অনেক। অন্তত পনেরটা অ্যানাউন্সমেন্ট দিতে হয়েছিল, অমুকের বাচ্চাকে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ পেয়ে থাকলে স্টেজের কাছে এসে রেখে যান। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত সবাইকেই পাওয়া গিয়েছিলো।

প্রোগ্রামে একটা বড় ডিস্টার্বেন্স ছিলেন জনৈক এডিএসএ। বারবার এসে আমাকে বলছিলেন, বাপ্পী এভাবে অ্যানাউন্সমেন্ট দাও, ‘ঘুড়ি উৎসব হচ্ছে। চমৎকার উৎসব। আপনারা আসুন। দেখে যান। এমন উৎসব আর হয় না …’। পোলাপান হারানো আর এই এডিএসএ; এ দুইটা ছাড়া আর কোনো ডিস্টার্বেন্স ঘটেনি সেদিন।

সেদিনই আইয়াজ হোসেন চিশতি স্যার ডিএসএর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিলেন। মঞ্চেই। আমাদের সামনেই নতুন ডিএসএ হিসেবে দাঁড়ালেন মুনির স্যার।

মুনির স্যারের ডিএসএ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণে আমরা সংগঠনগুলো বেশ খুশি হয়েছিলাম। কারণ উনি আগে থেকেই ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গণে বেশ পরিচিত মুখ। ওঙ্কার-শৃণুতার উপদেষ্টা ছিলেন। সবাইকেই কাজের উৎসাহ দিতেন। সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন খুব ভালোভাবে। পরবর্তীতে আমার ক্যাম্পাস জীবনের বড় এক অংশের সঙ্গে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িয়ে থাকবেন তিনি। সে বিষয় প্রসঙ্গানুক্রমে আসবে ধীরে ধীরে।

নৃ-নাট্য তখন হাঁটছেও না, দৌড়োচ্ছেও না। রীতিমতো উড়ছে। এই তো কিছুদিন আগে নৃ-নাট্যেরই এক বড় ভাই, যিনি আমি ক্যাম্পাসে পা দেয়ার সময়েই শিক্ষক হয়েছিলেন; আরেক ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলেছিলেন; ‘আমরা (তিনি) পাশ করার পর নৃ-নাট্যের অবস্থা বেশ স্থবির হয়ে যায়; এবং বাপ্পী (আমি) সেই অবস্থা থেকে টেনে তোলে’। ওনার এই কথা সর্বতোপ্রকারে ভুল। হ্যাঁ! যদি তিনি ২০০৯-১০ এর কথা বলে থাকেন, সেক্ষেত্রে এ কথা কিছুটা সত্য হতে পারে। কারণ আমি যখন নৃ-নাট্যে ঢুকি, তখন গ্রুপে আর্কি, ব্যাড আর লাইফ সাইন্সসহ শুধু ০৪ এর সদস্যরাই আছে কুড়িজনের ওপরে। ০২ ব্যাচেরও ছিলেন অনেকে। ০৫ এর ছিলো তিন-চারজন। আর ০৬ আর্কির কিছু পোলাপান শুরুতে আসলেও পরে তারা ইনঅ্যাক্টিভ হয়ে যায়। এটা আমি আসার আগেই। আর এখন যে সময়ের কথা বলছি, তখন নৃ-নাট্যে ০৪ ব্যাচের অ্যাক্টিভ মেম্বার ছিল শৈবালদা, কোপা (রাকিব ভাই), সৌরভ ভাই, বিশ্বজিৎদা, সাগর ভাই, আরিফ ভাই (ব্যাড), কায়েস ভাই, তুলি আপু, বৈশাখীদি আর হৈমন্তীদি। ০৫ এর ছিল আসাদ ভাই, মেহরাব ভাই, লরা আপু। ০৬ এর ছিলাম আমি, ম্যাথের সাগর, রাজু, ইউআরপির নিশা, ০৭ এর ইউআরপির ইমতিয়াজ, নিয়াজ, ব্যাডের ইমতিয়াজ, শশী, আশিক, আনন্দ, আর্কির রেজওয়ান, কাশফি আর শোভন। একটা থিয়েটার গ্রুপ চালানোর জন্য যথেষ্ট। একটা বড় ধরনের ক্রাইসিস আমাকে সামাল দিতে হয়েছিলো ঠিকই। ইন ফ্যাক্ট একটা না। অনেকগুলা। কিন্তু সেগুলা তো পরের ঘটনা। আপাতত টু-টু পর্যন্ত নৃ-নাট্য নিয়ে আমি ছিলাম নির্ভার, ঝামেলামুক্ত। যদিও আমি ততদিনে হয়ে উঠেছি ক্যাম্পাসে শিবিরসহ সব ধরনের রাজনৈতিক অপতৎপরতা প্রতিরোধী মোর্চার এক গুরুত্ৱপূর্ণ সৈনিক, সংগঠনগুলোর এক সোচ্চার আওয়াজ। আর নাট্যচর্চা তো চলছিলই।

যাই হোক, এত লোক থাকা সত্ত্বেও মান্যবর ভুল করছেন নাটকটা বেছে নেয়ার পেছনে আরেকটা কারণ ছিল, অধিক কুশীলবের নাটকে কোনো একবার ছেদ পড়লে, সেটা নতুন লোক দিয়ে পরের বার আবার নতুন করে তোলা মুশকিল ও যন্ত্রণাদায়ক। বিশেষ করে আমার অভিজ্ঞতা বলে পরের টিমটার কাজের মান আগের টিমের ধারেকাছেও যায় না। ফলে, সেটা সবার জন্যই হতাশাদায়ক। কিন্তু অল্প ক্যারেক্টারের নাটকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একই সময়ে এক সঙ্গে প্রত্যেকটা ক্যারেকটারের একাধিক বিকল্প দাঁড় করানো যায়।

611_1064502326999_5026_n

 

যাই হোক, শুরু হলো মান্যবর ভুল করছেনের রিহার্সেল। নাটক ডিরেকশনের দায়িত্ব পেলাম আমি। প্রথমে আমি করছিলাম সূত্রধর। বিকল্প ছিল মেহরাব ভাই। রাকিব ভাই আর আরিফ ভাই রিহার্সাল দিচ্ছিল পালা করে দ্বিতীয়ের চরিত্রে। তৃতীয়ের চরিত্র ছিল আসাদ ভাইয়ের। চতুর্থ শোভনের। ওর বিকল্প আসলে রাখা হয়নি। কারণ এটি ছিল মূলত একটি নারী ক্যারেক্টার। কিন্তু নৃ-নাট্যের নারীদের কাউকেই সে সময় পাওয়া যাচ্ছিল না। কারো প্রজেক্ট চলছে, তো কেউ এক টার্মের জন্য নৃ-নাট্য থেকে বলেকয়ে অফ নিয়েছে। বাকি ছিল কাশফি। কিন্তু ওর মতো মারদাঙ্গা অ্যাপিয়ারেন্সে চতুর্থের কনফিউজড ক্যারেক্টারটা ফোটানো অনেক মুশকিল ছিল। অগত্যা সেবারের মতো চরিত্রের লিঙ্গই বদলে ফেলা হলো।

 

 

পঞ্চমের চরিত্র ছিল মারুফ ভাইয়ের। দুয়েকজন বিকল্প ছিল সম্ভবত। কিন্তু মারুফ ভাইর সামনে দাঁড়ানোর মতো ছিল না কেউই। তখন আমরা রিহার্সাল করি এক নম্বর একাডেমিক বিল্ডিংয়ের পেছনের গেট পেরিয়ে ঢুকে সিঁড়ির সামনে যে ফাঁকা জায়গাটা সেখানে। জায়গাটা ছিল ব্যাডের। আমাদের ডিন তখন মামুন স্যার। নমস্য লোক। চাইতেই জায়গাটা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি আমাদের জন্য।

কোনো ধরনের বড় ঘটনা ছাড়াই টার্ম ফাইনাল হলো। টার্ম ফাইনাল শেষে আমরা উঠে গেলাম টু-টুতে। ক্যাম্পাসে এলো ০৮। এর মধ্যে পরীক্ষা আর টার্ম গ্যাপের কারণে রিহার্সালে একটা বিরতি পড়লো। তবে আড্ডা আমরা নিয়মিতই দিতাম। যতো কাজই থাকুক আর না থাকুক, তপনের দোকানে বসে আধঘণ্টা একসাথে আড্ডা না দিলে আমাদের আর পেটের ভাত হজম হয় না। রাতেও প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের অন্তত ১০-১৫ মিনিট করে আড্ডা হয়। হয় হলে, নয়তো নিরালায়। যাই হোক টার্ম শুরুর পর বিরতির কারণে ধরতে গেলে আবার শুরু থেকেই শুরু করতে হলো। কারণ আমরা তখনো রিডিংয়ে।

এর মধ্যেই চলে একটা বড় গ্যাপ। সোনাডাঙ্গার সংঘর্ষের কারণে। ম্যাথ ০৬-এর কয়েকজন ঢাকায় আসার জন্য সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে হানিফের বাসের টিকিট কেটেছিল। কিন্তু বিপত্তি বাধে ওদের সঙ্গের পিসি নিয়ে। এর জন্য এক্সট্রা টাকা দাবি করে বসে পরিবহন শ্রমিকরা। এ নিয়ে কথা কাটাকাটি থেকে বিষয়টা রূপ নেয় হাতাহাতি। সোনাডাঙ্গার শ্রমিকদলের দুই নেতা ওদের রড দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে।

খবরটা ক্যাম্পাসে আসে সন্ধ্যাবেলায়। আমি তখন ক্যাম্পাস থেকে সদ্যপ্রসূত ০৮ (সম্ভবত মাসখানেক হয়ে গিয়েছিল ওদের ক্যাম্পাসে আগমনের) এর দুই জুনিয়রকে নিয়ে খাবা হলের পাশে আলেক চাচার দোকানে এসে চা খাচ্ছি। এমন সময় ব্যাড ০৭ এর ইমতিয়াজ দৌড়াতে দৌড়াতে সেখানে এসে জানালো, বায়োটেক ০৩ ব্যাচের লেনিন ভাই আমাকেসহ ০৬ এর কয়েকজনকে খুঁজছেন। খাজা হলে ফিরতে ফিরতে রাস্তাতেই সব ঘটনা জেনে গেলাম। পোলাপান সব হলের পাশের রাস্তায় এসে জড়ো হচ্ছে। লেনিন ভাই, সত্যদা, নাসিম ভাই, প্রতাপদাসহ ০৩ ব্যাচের সিনিয়ররা পোলাপান যাতে সোনাডাঙ্গায় মারামারি করতে না যায়, সে চেষ্টা করছে। ঘটনা দেখেই আমি আর সেখানে কথা বাড়াতে যাইনি। দেখলাম আমাদের ০৬ এর একটা গ্রুপ ওদের কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা হনহন করে এগিয়ে গেল। আমাকে দেখে দাঁড়ালো। আমিও কোনো কথা না বলে সঙ্গী হলাম। নীতিকথা নয়। আমরা তখন অ্যাকশনে বিশ্বাসী।

আসলে আমরা ০৬ এর পোলাপান তখন চূড়ান্ত প্রকৃতির বুনো স্বভাবের হয়ে উঠেছিলাম। কারণ এরই মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে র‍্যাগ ইস্যুকে কেন্দ্র করে একটা ব্যাচকে টার্গেট করে কঠোর শাস্তি দিয়ে অন্যদের ঠাণ্ডা করার একটা স্ট্র্যাটেজি নিয়েছিল মাহবুবুর রহমান প্রশাসন। আর সে ঝড় বয়ে গেছে আমাদের ওপর দিয়ে। ভার্সিটির ১৬ ডিসিপ্লিনে আমার ব্যাচের কতজন সাসপেনশন খেয়েছে, সে হিসেব রাখাটাও আমরা এক পর্যায়ে ছেড়ে দিয়েছিলাম।

যাই হোক, আমরা তখন খ্যাপা। গল্লামারি ব্রিজ পার হয়েই দুই-তিনটা ট্রাক থামিয়ে তাতে উঠে পড়লাম আমরা। সব ০৬ এর পোলাপান। ততক্ষণে আমাদের ক্ষ্যাপামিতে ০৩ ব্যাচের সিনিয়ররাও আতঙ্কে। বুঝিয়ে সুঝিয়ে তারা আমাদের ট্রাক থেকে নামাতে পেরেছিলেন ঠিকই। কিন্তু ফেরাতে পারেননি। আমরা তখন রাস্তার দুই পাশে ভাংচুর করতে করতে এগোচ্ছি সোনাডাঙ্গার দিকে। অন্যদিকে ০৪ বা ০৫-ও আমাদের আটকানোর চেষ্টা না করে যোগ দিয়েছে আমাদের তাণ্ডবলীলায়। মোটামুটি আমরা হাজার খানেক পোলাপান প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত। একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু কি করতে হবে জানি না। কারণ, আমাদের যারা পথ দেখানোর কথা সেই ০৩-এর ভাইদের আমাদের সহিংসায় সায় নেই।

সোনাডাঙ্গায় গিয়েই পুলিশের বাধা। আমরা মোটামুটি হাজার খানেক বা হাজার দেড়েক হলেও, সোনাডাঙ্গায় জড়ো হওয়া শ্রমিকেরা সংখ্যায় অনেক বেশি। পুলিশ আমাদের বোঝাতে চাইলো। আমরা বুঝলাম না। পুলিশ আমাদের সঙ্গে তর্ক করেই চলেছে। ততক্ষণে আমাদের উত্তেজনা কমে যুক্তিতে কান দেয়ার পর্যায়ে চলে এসেছে। এবার ০৩-এর ভাইরা মবের কন্ট্রোল ফিরে পেলেন। তারা আমাদের বোঝাতে সক্ষম হলেন, আমাদের এখন যা করার নিজেদের ঘাঁটি অর্থাৎ ক্যাম্পাসে ফিরেই করতে হবে। এ অবস্থায় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলেও আমরা ফিরে চললাম। এবার সোনাডাঙ্গা টার্মিনাল থেকে গল্লামারি পুলিশ বক্স পর্যন্ত যা কিছু সামনে পাওয়া গেল, পোলাপান ভাঙতে ভাঙতে ফিরলো।

এক পর্যায়ে পোলাপান জিরোপয়েন্ট বন্ধ করে দিল। আমরা লাঠিসোঁটা রড নিয়ে বসে আছি। অবরোধ মানে অবরোধ। পায়ে না হেঁটে কোনো মানুষ জিরো পয়েন্ট পার হতে পারবে না।

আরেকটা জমায়েত ছিল মেইনগেটের সামনে। ভোরের দিকে জিরো পয়েন্টের দোকানের সিগারেট শেষ। তাই আমি সিগারেট কিনতে মেইনগেটের সামনে এলাম। এমন সময় দেখি ০৫ এর আকিক ভাই আর আমাদের ব্যাচের সৌরভসহ ডিসিপ্লিনের কয়েকজন আসছে আমাকে খুঁজতে। আমার চণ্ডাল আর অপরিণামদর্শী রাগ নিয়ে এদের মনে বরাবরই একটা শঙ্কা কাজ করতো। এ কারণে তারা সারারাত বেশ টেনশনের মধ্যে ছিল। খুঁজেছেও। কিন্তু পায়নি। যাই হোক, ভোরবেলা আকিক ভাই খুঁজে পেল। তার যুক্তি ছিল, আমার সেন্স কাজ করছে না। তাই আমার ঘুম প্রয়োজন। ঘুম থেকে উঠলে আমি যা ভালো মনে করবো, কেউ বাধা দেবে না। আকিক ভাই, জাহিদ ভাই, সৌরভ, জাহিদ সবাই এক প্রকার টানতে টানতেই আমাকে হলে নিয়ে গেল। ঘুমিয়েছিলাম ঘণ্টাদুয়েক। এর মধ্যেই রুমের দরজায় আঘাত। ঘুম ভাঙলো। দেখি ইএস০৩- এর আলাল ভাই দরজায় বাড়ি দিচ্ছে। কি হয়েছে? শুনলাম পুলিশের সাথে পোলাপানের সংঘর্ষ হচ্ছে। আমি তালাবদ্ধ অবস্থায় রুমে একা। আমার রুমমেটরা কই? সবাই গিয়েছে মারামারি করতে। খাজার বারান্দাগুলোয় সে সময় গ্রিল দেয়া ছিল না। আমরা একরুমের ব্যালকনি বেয়ে বেয়ে আরেক রুমে চলে যেতাম। আমিও সেভাবে ব্যালকনি বেয়ে ২০৫ নম্বর রুম দিয়ে বেরিয়ে এলাম।

এর পর নেমেই সালাম ভাইর দোকানের সামনে লাকড়ির স্তুপ থেকে একটা লাকড়ি নিয়ে সোজা গল্লামারি ব্রিজ। পুলিশের সঙ্গে তখন মারাত্মক সংঘর্ষ ছাত্রদের। একের পর এক টিয়ারশেল ফুটছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। বেলা যতো গড়ায়, সংঘর্ষের তীব্রতা ততো বাড়ে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আমার বন্ধু আবিরকে ধরে নিয়ে গেলো পুলিশ। ব্যাস আর পায় কোথায়, আমরা কয়েকজন তখন উন্মত্ত হয়ে উঠলাম।

আমিসহ আমরা কয়েকজন অবস্থান নিয়েছিলাম ভিসির মাঠের পেছনের গেটটায়। ওই পয়েন্টটায় একটা মোটামুটি বড় ধরনের গোলমাল বেধে গেল। তুহিন ভাই তখন এডিএসএ প্যানেলের একজন। তিনি এলেন আমাদের থামাতে। আমার মনে আছে, তিনি একের পর এক কথা বলছেন; আর আমার একটাই উত্তর ‘আবির কই?’ কোনো আশ্বাসে কাজ হচ্ছে না। তিনি অসহায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর চলে গেলেন।

এর মধ্যে হঠাৎ করেই ক্যাম্পাসে শিবিরের পরিচিত কিছু মুখকে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা গেল। আবার এমন কিছু মুখকে দেখা গেল, যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর লাইব্রেরিতে খালেদা জিয়ার ছবি ছিঁড়ে আলোচনায় আসার চেষ্টা করতে গিয়েও সাসপেন্ড হয়েছে।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল এলো। ক্ষুধার্ত, দুর্বল, টিয়ারশেলের অত্যাচারে আমরাও তখন বিপর্যস্ত। এতোক্ষণে এদের সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখে ক্যাম্পাসের অনেকেই আমরা প্রমাদ গুণলাম। এরই মধ্যে খবর এলো ক্যাম্পাস প্রশাসন আবিরকে ছাড়াতে গেছে। আবিরকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হবে এই নিশ্চয়তা পাওয়ার পরপর আমরাও একটা এক্সিট রুট খুঁজছিলাম। যাই হোক। প্রশাসন নিজের অজান্তেই সেটা দিয়ে দিলো হল ভ্যাকেন্টের ঘোষণা দিয়ে।

প্রকৃতপক্ষে গোটা বিষয়টার পুরোটাই ছিল ভুলভাল। একটা স্বতস্ফূর্ত সংঘর্ষ। প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থেকে উদ্দেশ্যহীন ভাঙচুর। আবার ক্যাম্পাসে একের পর এক সাসপেনশনজনিত কারণে তৈরি অবদমিত ক্রোধের বিষ্ফোরণ- এছাড়া পুরো বিষয়টা আর কিছুই ছিল না। কিন্তু অপরাজনৈতিক শক্তিকে সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখে আমাদের সতর্ক হয়ে ওঠা এবং এক্সিট রুটের অপেক্ষা করার মধ্য দিয়েও একটা বিষয় প্রমাণ হয়েছিল, আমরা প্রাণ দিতে রাজি। ক্যাম্পাসে রাজনীতি ঢুকতে দিতে রাজি না। কোনোভাবেই না।

এই ঘটনাটা একটা বড় বিশ্লেষণ দাবি করে। কিন্তু এ মুহূর্তে আমি আমার সে সময়ের সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে আলোচনা না করে এর অতিরিক্ত কিছু লিখতে চাচ্ছি না।

প্রায় ১৫দিন পর ক্যাম্পাস খুললে আমরা আমাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে এলাম। আবারো মান্যবরের রিহার্সাল শুরু হলো। এবং আবারো শুরু থেকে।

611_1064502286998_4680_n

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s