নৃ-কল্প [বর্ষ- ৫, সংখ্যা-১৭]

Screenshot (3)

জহির রায়হান

বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন শুধু এদেশের রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, শিল্প সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও নতুন চেতনা প্রবাহ সৃষ্টি করেছিলো। এই চেতনা ছিলো অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক এবং সামাজিক মূল্যবোধসঞ্জাত। আমাদের শিল্প সাহিত্যে যারা এই চেতনার ফসল, তাঁদের ভেতর জহির রায়হানের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারন ভাষা আন্দোলনে তিনি শুধু যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেছেন তা নয়, তাঁর সাহিত্য প্রেরনার মূল উৎস ছিলো এই আন্দোলন।ভাষা আন্দোলনের উপর প্রথম সার্থক উপন্যাস – ‘আরেক ফাল্গুন’ সহ অজস্র ছোটগল্প ও নিবন্ধ লিখেছেন তিনি। এইসব লেখা এবং তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ভাষা আন্দোলনের আবেগ, অনুভূতি তাঁকে প্রচন্ডভাবে আপ্লুত করে রেখেছিলো।

লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভের পর জহির রায়হান চলচ্চিত্রের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন পঞ্চাশ দশকের শেষে। ষাট দশকের শুরুতে জহির রায়হান একজন পরিপূর্ণ চলচ্চিত্রকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’, ‘কাঁচের দেয়াল’ নির্মানের মাধ্যমে। এরপর অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে কয়েকটি বানিজ্যিক ছবি বানালেও তিনি তাঁর লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। বানিজ্যিক ছবি বানাবার সময় তাঁর শিল্পসত্তা যতটুকু বিপর্যস্ত হয়েছিলো, যে তীব্র মানসিক যাতনার স্বীকার হয়েছিলেন তিনি, তার কিছুটা লাঘবের জন্য আবার সাহিত্যের দ্বারস্থ হয়েছেন, উপন্যাস লিখেছেন ‘হাজার বছর ধরে’। ‘ইচ্ছার আগুনে জ্বলছি’ আর ‘কতগুলো কুকুরের আর্তনাদ’ – এর মতো গল্প লিখে জ্বালা মেটাতে চেয়েছেন।

জহির রায়হানের রাজনৈতিক চেতনা

‘কাঁচের দেয়াল’ বানাবার পর তিনি ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মানের পরিকল্পনা গ্রহন করেন। কিন্তু তিনি প্রযোজক পাননি। যখন নিজে চলচ্চিত্র প্রযোজনা করার পর্যায়ে এলেন তখন বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাঁর পরিকল্পিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ ছিলো একটি রাজনৈতিক ছবি, আইয়ুবের স্বৈরাচার আমলে সে ধরনের ছবি বানানো ছিলো একেবারেই অসম্ভব। এজন্যই তিনি প্রতীকের আশ্রয় নিয়ে ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের উর্মিমুখর দিনগুলিতে বানিয়েছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। এ ছবিতে একুশে ফেব্রুয়ারীর প্রভাত ফেরী এবং আন্দোলনের দৃশ্যে জহির রায়হানের রাজনৈতিক আবেগের যে তীব্র প্রকাশ ঘটেছে, বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না ভাষা আন্দোলনের শেকড় তাঁর চেতনার কত গভীরে প্রোথিত। এরপর আরো বড় ক্যানভাসে সর্বজাতির সর্বকালের আবেদন তুলে ধরতে চেয়েছিলেন ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ – এ, যে ছবি তিনি শেষ করতে পারেননি। এর কিছুটা আভাষ পাওয়া যাবে স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ‘স্টপ জেনোসাইড’- এ। ১৯৭২ এর দুর্ঘটনায় এভাবে হারিয়ে না গেলে হয়তো স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি বানাতেন আরো সব অসাধারন সিনেমা।

বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনে জহির রায়হানের অংশগ্রহণ কোন আকস্মিক বা নিছক আবেগাড়িত ঘটনা ছিলো না। তাঁর রাজনৈতিক জীবন-প্রবাহের স্বাভাবিক গতি তাঁকে যুক্ত করেছিলো এই আন্দোলনের সঙ্গে। যে কারনে শুধু বায়ান্নতে নয়, ঊনসত্তর বা একাত্তরেও তাঁকে খোলাখুলি আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়াতে হয়েছে। বায়ান্ন সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী প্রথম দশজন ছাত্রের গ্রুপে জহির রায়হানও ছিলেন। প্রথম দিকে যারা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গেছে পুলিশ তাদের ট্রাকে চাপিয়ে সোজা লালবাগে নিয়ে গেছে। পরে ছাত্রদের মনোভাব দেখে পুলিশ গুলি চালিয়েছিলো। তাঁর সমসাময়িক লেখক-শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন রাজনীতির প্রতি সবচেয়ে বেশি অঙ্গীকারবদ্ধ। তিনি সব সময় খোলাখুলি তাঁর রাজনৈতিক মত ব্যক্ত করতেন। এর জন্য তাঁকে যথেষ্ট নিগ্রহের সম্মুখীন হতে হয়েছে। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে এই রাজনীতির জন্যই তাঁকে অকালে হারিয়ে যেতে হয়েছে।

স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় অগ্রজ শহীদুল্লাহ কায়সারের প্রভাবে তিনি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। শহীদুল্লাহ কায়সার তখন কোলকাতার একজন ছাত্রনেতা। প্রকাশ্যে ছাত্র ফেডারেশনের সাথে এবং গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত। জহির রায়হান তখন পার্টি-কুরিয়ার ছিলেন। পার্টির আত্মগোপনকারী সদস্যদের মাঝে চিঠিপত্র ও খবর আদান প্রদানের কাজ করতেন। প্রকাশ্যে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র ‘স্বাধীনতা’ বিক্রি করতেন।

রায়হান ছিলো তাঁর পার্টি পরিচয়ের ছদ্মনাম। তাঁর পিতৃদত্ত নাম মোঃ জহিরুল্লাহ। জহির রায়হান পরবর্তী সময়ে সরাসরি পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন না। তাঁর সেই সময়ের লেখা কিছুটা রোমান্টিক ও আবেগবহুল হলেও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম তিনি তখনকার গল্প উপন্যাসে যথেষ্ট দক্ষতা ও দরদের সঙ্গে এঁকেছেন।

১৯৬৬ সালে চীন ও সেভিয়েত ইউনিয়নের পার্টির মতাদর্শগত বিরোধের ফলে অন্যান্য দেশের মতো এখানকার কমিউনিস্ট পার্টিও দ্বিধাবিভক্ত হয়। ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন মস্কোপন্থী আর বোন নাফিসা কবির পিকিংপন্থী। জহীর রায়হান ছিলেন দ্বিধাগ্রস্থ। পার্টি ভাঙ্গার জন্য তিনি সরাসরি পার্টির নেতৃস্থানীয় লোকজনের সমালোচনা করতেন।সরাসরি সম্পর্কিত না থাকলেও তিনি চীনের লাইন সমর্থন করতেন।

১৯৭০ সালে জহির রায়হান ‘এক্সপ্রেস’ পত্রিকা বের করেন এবং এর যাবতীয় খরচ তিনি একাই বহন করতেন। ‘এক্সপ্রেস’ ছিলো রাজনীতি সচেতন পত্রিকা। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ থেকে পাকিস্থানী সৈন্যরা এদেশে যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ শুরু করে জহির রায়হান এতে এত বেশি বিচলিত বোধ করেন যে, রাতের পর রাত তিনি অস্থির ও নির্ঘুম অবস্থায় কাটিয়েছেন। মাও সে তুং এর প্রবন্ধাবলীর দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দীর্ঘস্থায়ী গনযুদ্ধের কথা ভাবতেন।পার্টির কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে তিনি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ঢাকা ছেড়ে আগড়তলা এবং পরের কোলকাতা চলে যান। কোলকাতায় তিনি প্রচার কাজ সংগঠিত করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি নানা বাধার সম্মুখীন হন।এমনকি তাঁর ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি নির্মানের সময় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁকে নানাভাবে বাধা দিয়েছে। বিভিন্ন সেক্টরে শুটিং করতে দেয়নি, এমনকি কোন কোন সেক্টরে তাঁর গমন পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিলো। অবশেষে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত বাজেট ও সময়ে ৭ নম্বর সেক্টরে এই অপূর্ব ছবিটির নির্মান কাজ শেষ করেন। কিন্তু তারপর এই ছবির ছাড়পত্র পেতে তাঁকে আবার অনেক দৌড়-ঝাঁপ করতে হয়। কারন সিনেমায় সরাসরি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য উত্থাপন করা হয়েছে। অথচ তখনো আওয়ামী লীগের কিছু নেতারা মার্কিন সাহায্যের পেতে উন্মুখ ছিলো।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর শহীদুল্লাহ কায়সারের মৃত্যু সংবাদ শুনে জহির রায়হান একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে হানাদার বাহিনীর দোসরদের নামে শ্বেতপত্র প্রকাশের ঘোষনা দেয়। ’৭২ এর ৩০ জানুয়ারি অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোনে পাওয়া খবর শুনে তিনি মিরপুরে যান তার অগ্রজকে খুঁজতে। মিরপুর তখনো হানাদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ। তার মিরপুরে যাওয়াটাই কাল হলো। তদন্ত করলে হয়তো জানা যেত সেই অজ্ঞাত টেলিফোন কোত্থেকে এসেছিলো, যেখানে তাঁকে বলা হয়েছিলো শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে আছেন কিংবা মিরপুর থেকে কিভাবে তিনি উধাও হলেন। এটাও বিস্ময় যে, তাঁর অন্ত্রর্ধান সম্পর্কে কোন তদন্ত হয়নি।

[তথ্যসূত্রঃ অন্তর্জাল
একুশে ফেব্রুয়ারি; জহির রায়হান। ভূমিকা; শাহরিয়ার কবির]

   নৃ-কল্প; থিয়েটার বিষয়ক ভাঁজপত্র
প্রকাশনায় : নৃ-নাট্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রথম প্রকাশ : ১৩ মার্চ, ২০১২

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s