স্মৃতির ঝাঁপি


পর্ব: চার

ইচ্ছে একটাই: সব বদলে যাবে


 

০১.

কি লিখব? এখন যে সময়টার বর্ণনা শুরু করতে যাচ্ছি, সেটা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে স্বর্ণালী অধ্যায়। আমার জীবনেও তাই। এ সময়টায় অনেক দেখেছি, ঠেকেছি, বুঝেছি এবং শিখেছি। আমার বন্ধু, সহপাঠী, সহযোদ্ধা, বড় ভাই, আদরের জুনিয়র— কত শত নাম এসে ভিড় করছে মাথার ভেতর; এদের সবাইকে মিস করি খুব।

২০০৭ সালের নভেম্বরে উপকূলীয় জেলাগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে গেল সিডরের তাণ্ডব। সেই ঝড়টার কথা মনে আছে খুব। পরদিন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আসার আগে শুধু ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি দেখেই পোলাপান সিদ্ধান্ত নিল, ত্রাণ তোলা হবে। সারা খুলনা ঘুরে ঘুরে কয়েক লাখ টাকা তোলা হলো। টাকার পরিমাণটা ঠিক মনে নেই। সিডরের ত্রাণ তুলতে যাওয়াটা একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা ছিল। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা টাকা তুলছে শুনে খুলনাবাসীও এগিয়ে এল। গোটা খুলনাবাসী সে সময় দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আমরা ত্রাণ তুলেছিলাম মোটে দুই দিন। শুধু তাতেই খুলনা থেকে যে পরিমাণ নগদ টাকা এসেছিল, সে সময়ের হিসেবে তো বটেই, এখনকার হিসেবেও তা অনেক। আর কাপড়চোপড়ের তো কোনো হিসেব নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেয়েছিল এ সহায়তা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়ে পত্রিকায় ছবি ছাপাতে। কিন্তু আমরা শিক্ষার্থীরা খুলনাবাসীর বিশ্বাস ভেঙে কোনো অজ্ঞাতনামা তহবিলে টাকা দেয়ার পক্ষপাতি ছিলাম না। ত্রাণ দেয়ার দিন ক্লাসপরীক্ষা বাদ রাখা এবং দুটি বাস বরাদ্দ দেয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো দাবি ছিল না। যাই হোক, এ জায়গায় কর্তৃপক্ষ কোনো ভেজাল করেনি।

খাজা হলের টিটিরুম ভর্তি কাপড়। চাল-ডালের প্যাকেট করা হয়েছিল ডাইনিং ফাঁকা করে। আমরা ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম রামপালে। পথে ঝড়ে পড়ে যাওয়া গাছের ডাল কেটে কেটে এগুতে হয়েছিল। সে এক অদ্ভুৎ অভিজ্ঞতা।

এর পর ডিসেম্বরে সেই প্রোগ্রাম, যার কথা আগেই বলেছি। যে প্রোগ্রামে বাধা পড়ায় আমরা আন্দোলনে নেমেছিলাম। এর পর বছর শেষ হলো। ২০০৮ সাল আসল। আমাদের পিএল-পরীক্ষা সব ভালোয় ভালোয় শেষ হলো। এর পর টার্ম গ্যাপে আমি আর বাড়ি আসিনি। হলে থেকে গেলাম।

এর মধ্যেই এল বাবলু-রাসেল আর কাজলের সাসপেনশনের ঘোষণা। সে সময় হলে আমি একা। আর কেউ নেই। বাবলুরা নিরালায়। আমরা কয়েকজন কিছু একটা করতে চাইলেও আমাদের মধ্যে দুয়েকটা কাওয়ার্ড ছিল। ডিএসএর অনুমতি নিয়ে আন্দোলন করার বুদ্ধি ছাগলগুলার মাথায় যে কে দিয়েছিল, ওরাই জানে। সে সময় অনেক কিছুই হতে পারত। কিন্তু গবেটগুলোর নির্বুদ্ধিতা আর গোঁয়ার্তুমিতে কিছুই হয়নি। একটা জিনিষই ভালো হয়েছে সে সময়। আন্দোলন নিয়ে সে সময় আমাদের চেয়ে ০৭ এর উৎসাহ ছিল বেশি। ওদের যে ঘুঁটি বানিয়ে বলি দেয়া হয়েছে, সেটা উপলব্ধি করতে পেরে, ওরাও বদনামটা ঘুঁচানোর প্রয়াস নিয়েছিল। এবং আমাদের ব্যাচের ছেলেপেলেরাও ওদের সঙ্গে সহজ হতে শুরু করল।

সেট স্কুলেরও তখন টার্ম গ্যাপ। আর লাইফ সায়েন্সের পিএল চলছে। এর মধ্য দিয়েই চলে এল একুশে ফেব্রুয়ারি। সেন্ট্রাল প্রোগ্রামে নৃ-নাট্যের প্রতিনিধিত্ব করার মতো তখন আমি ছাড়া আর কেউ খুলনায় নেই। সবাই তখন যার যার বাড়ি, অথবা থিসিস নিয়ে ব্যস্ত। ক্যাম্পাস অর্ধেক ফাঁকা। লোকজন নেই, অন্য সংগঠনগুলো দোনোমনা করছে; কারোরই পোলাপান ফ্রি নেই। আর আমার হাতে অফুরন্ত টাইম। ডিসিপ্লিনেরও হলবাসী লোকজন খুলনায় আছে হাতেগোনা দুয়েকজন। খাজা-২০৪ এ আমি একা।

যাই হোক একুশে ফেব্রুয়ারি ঘণিয়ে আসার পর আহ্বায়ক হিসেবে 35mm (এই সংগঠনটারও তখন দীপ আর মিঠু ছাড়া আর কেউ খুলনায় নাই। মিঠুর তখন পিএল চলছে। আর দীপের হাতেও প্রচুর সময়।) সমন্বয় কমিটির মিটিং ডাকল। এজেন্ডা একটাই- একুশের প্রোগ্রাম। সে সময় মূল প্রশ্নটা ছিল, খুলনা আছি আমরা হাতেগোনা এই কয়েকজন। প্রোগ্রাম নামবে কিভাবে? আলোচনা শুরুর পর নাসিম ভাই এমন এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিল, আমরা পারলে সেদিনই প্রোগ্রাম নামিয়ে ফেলি।

সমন্বয় কমিটির বৈঠকে আমরা ৭ হাজার টাকার একটা বাজেট তৈরি করলাম। ডিএসএ দিল ৩ হাজার। সে টাকা দিয়েই প্রোগ্রাম নামল। অনেক পরে এর চেয়ে অনেকগুণ বেশি বাজেটে একুশের প্রোগ্রাম নামতে দেখেছি। কিন্তু বিগ বাজেটের সেসব প্রোগ্রাম এত কম টাকায় নামা প্রোগ্রামগুলোর মত মানসম্পন্ন হতে পারেনি কখনোই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, বিগ বাজেটের প্রোগ্রামে একুশের ব্রেক ড্যান্স দেখার মতো দুর্ভাগ্যও আমাদের হয়েছে। আমাদের সময় আমরা প্রত্যেকটা প্রোগ্রামের একটা করে নাম ঠিক করতাম। এই প্রোগ্রামটার নাম দিয়েছিল দীপ ভাই (আর্কি’ ০৫) – ‘আগুনের অক্ষর’। প্রোগ্রাম সমন্বয়ক করা হলো থিয়েটার নিপুনের সায়েম ভাইকে (অথবা দীপ ভাইকে!)। প্রোগ্রামে ডেকোরেশনের দায়িত্ব ছিল আমার। সাজসজ্জা খারাপ হয়নি। এই প্রোগ্রামে আমার একটা ভয়ঙ্কর প্ল্যান ছিল। শহীদ মিনারের সামনে ফাঁকা গ্রিন বক্স দুটোর মাঝখানে লাঠি-লাকড়ি বসিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হবে। এই ছিল আমার প্ল্যান। এমন না যে বাজেটে কুলোয়নি। কিন্তু আমার মতো খ্যাপা আগুন নিয়ে কিছু একটা করছে; ক্যাম্পাসের সিনিয়রদের কাছে এটাই ছিল সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়। দীপ-মিঠু বিষয়টাতে যথেষ্ট উস্কানি দিলেও নাসিম ভাইদের জোরাজুরিতে আইডিয়াটা বাদ দিতে হল। এর পরে বহুদিন আমি শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে গ্রিন বক্স দুটোতে আগুন জ্বালিয়ে দিলে অন্ধকারে গোটা ল্যান্ডস্কেপটায় কতটা বিপ্লবী চেহারা চলে আসত, সেটাই ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করেছি।
আর পারফরমেন্সের কথা বলব কি! সময়মতো অনেকেই এসে হাজির। 35 mm একটা সিনেমা দেখাল। ভৈরবীরও কয়েকজন ভালো পারফরমার পাওয়া গেল, আমি সঞ্চালক ছিলাম, সঞ্চালনার ফাঁকে দুটো কবিতাও ঝেড়ে দিলাম। থিয়েটার নিপুনের একটা আবৃত্তির সেশন করার কথা ছিল। সব মিলিয়ে খিচুড়ি পাকিয়ে একটা ভালো প্রোগ্রাম নেমে গেল মাত্র ৩ হাজার টাকায়।

সে সময় দীপ, মিঠু আর আমি সারা দিন খাজা ২০৪-এ বসে আড্ডাবাজি করতাম। একদিন মাথায় আসল ক্যাম্পাসের ইভটিজারদের শাস্তি দিতে হবে। ক্যাম্পাসেরই ০৩ ব্যাচের এক বড় ভাই, তার নাম বলব না; সে ভদ্রলোকের একটু আলুর দোষ ছিল। তবে আলুর দোষ না বলে ঘিলুর দোষ বলাই ভালো। ক্যাম্পাসে তখন কোনো ডিসিপ্লিনের কোনো ব্যাচ বাকি ছিল না; যার কোনো না কোনো মেয়ের পেছনে সে ধর্ণা দেয়নি। আমার এক বন্ধুকেও তার মনে ধরেছিল। শুধু তার সাথে আলাপ করিয়ে দেয়ার জন্য ভদ্রলোক আমাকে খাইয়েছেও প্রচুর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার নিজেরই গিয়ে আলাপ করতে হয়েছে। এখানে আমার দোষ নাই, আমি তো তারে বলি নাই; ‘‌ভাই খাওয়ান, আলাপ করিয়ে দেব’। যাই হোক, এ রকমই এক অলস দিনে আমি, দীপ আর মিঠু সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে শাস্তি দিতে হবে। দীপ তাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘তুমি কি অমুক বলছ? আমি পরিচালক ফারুকী বলছি। আমি মিঠুর কাছে তোমার অনেক প্রশংসা শুনেছি। তুমি কি আমার পরবর্তী সিনেমায় লিড রোল প্লে করতে পারবে’? শুনে তো ব্যাটা কাইত। ব্যাটার চেহারাও একটু চকলেট চকলেট ছিল। সুতরাং আগে কেউ হয়তো বদমায়েশি করতে গিয়ে তাকে এ ধরণের কোনো দুরাশাও দিয়ে থাকবে। যাই হোক, ভদ্রলোক টোপ গিলিলেন এবং ফান্দে পড়িলেন। পরিচালকের সাথে দেখা করতে নায়ক ঢাকাঅব্দি এসেছিলেন বটে, কিন্তু আর দেখা পান নাই। পাইবেন কি করিয়া? পরিচালক তখন খাজা হলে বসিয়া অলস সময় কাটাইতেছিলেন। এ রকম অনেক ঘটনা আছে সে সময়কার। বলতে গেলে মহাকাব্য লিখতে হবে। কেনো যেন, আমি কিছুই ভুলি না। সব মনে থাকে, পুঙ্খানুপুঙ্খ।

যাই হোক, নতুন টার্ম শুরুর দিন সাতেক আগেই নৃ-নাট্যের সবাই এসে হাজির। কারণ হাদিস পার্কে উদীচীর একটা নাট্যোৎসব আছে। সেটায় দল নিয়ে উঠতে হবে। হাতে একটা তোলা নাটক আছে, সময়ের গল্প। দুই দিনের রিহার্সালে নাটক উঠে গেল, এবং স্বাভাবিকভাবেই খুলনাবাসীর মাথা ঘুরে গেল। বরাবরই নৃ-নাট্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো তার শুভাকাঙ্খী বন্ধুরা। প্রতিটি শোয়ের আগে চেয়ারটেবিল টানা থেকে শুরু করে পোস্টার লাগানো বা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে হাত লাগানো রিহার্সালে প্রক্সি দেয়া পর্যন্ত; সব কাজেই সব সময় আমরা এমন সব লোকের সহায়তা পেয়েছি, আসলে এদের কখনো নৃ-নাট্যের বাইরের কেউ বলে ভাবা সম্ভব ছিল না।

উৎসবে থিয়েটার নিপুনের প্রেজেন্টেশন ছিল ‘বৌ’। ওই নাটকটাও বেশ প্রশংসা পেল। কিন্তু এখানে সবচেয়ে সিগনিফিকেন্ট ঘটনা হলো, ওই শোয়ের দিনই আমার প্রথম ইমতিয়াজ (ইউআরপি) আর নিয়াজের সঙ্গে আলাপ হয়। ওদের আগেও ক্যাম্পাসে দেখতাম। সে সময় ওদের আমার মনে হতো ০৭ এর বখে যাওয়া পোলাপান। ওই দিনই প্রথম ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়, এবং ধারণা বদলে যায়। ইউআরপিতে আমার দুই ম্যাকগাইভার বন্ধু অনেক হিসাব কিতাব করে রেখেছিল, কোন জুনিয়রকে কোন সংগঠনে পাঠাবে। ওদের হিসাব অনুযায়ী, নৃ-নাট্যে আসার কথা ছিল শুধু ইমতিয়াজেরই। নিয়াজের ওপর চাপ ছিল 35mm করার। কিন্তু, ওর নৃ-নাট্যই বেশি ভালো লেগে যায়। পরবর্তীতে ও নৃ-নাট্যেই চলে আসে। যাই হোক, পরবর্তীতে নৃ-নাট্য হোক বা ক্যাম্পাসের কোনো ইস্যু হোক; এই দুজনের ওপরেই আমি নির্ভর করে ছিলাম সবচেয়ে বেশি। এদের ওপর আমার আস্থা আর বিশ্বাস এতটাই বেশি ছিল; অনেক দিন পরে একবার মারাত্মক এক মুহূর্তে চেতন ফিরে পেয়েই আমি প্রথমেই জানতে চেয়েছিলাম, ইমতিয়াজ-নিয়াজ কই? কারণ আমার ভেতরে একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল, এরা না আসা পর্যন্ত আমি একা কিছু ঠিক করতে পারব না। ওদের; বিশেষ করে ইমতিয়াজের ওপর আমার প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। এ কারণে ওর ওপরেই আমি ক্ষেপে যেতাম সবচেয়ে বেশি। ওর কাছ থেকে সব সময়ে নিঃস্বার্থ ও শর্তহীন আনুগত্য পেয়ে এসেছি। ও শুধু নামে আর ডাকে আমার জুনিয়র। কিন্তু আসলে ও আমার বন্ধু। চরম বিপদেও কখনো নিজেকে আমার একা মনে হয়নি। এখনো হয় না। শুধু ইমতিয়াজ আছে বলে।

যাই হোক, হাদিস পার্কের শোটা অনেক বেশি ভালো হয়েছিল। কলকাতার এক থিয়েটার ক্রিটিক সেদিন শো শেষে আমাকে খুঁজে বের করে নাটকটার বেশ প্রশংসা করেছিল। বিষয়টায় বেশ আনন্দ পেয়েছিলাম। গর্বও হয়েছিল যখন সে বলল, অনেকদিন সে এত কম রিসোর্স নিয়ে এত ভালো শো দেখেনি। মনে মনে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘আজগে আর দেকেচটা কি দাদা? এ তো স্যাম্পল ছিল! গোডাউন তো খুলিনি এখনো!’ সময়ের গল্পে ব্যাকগ্রাউন্ডে লাইভ মিউজিকের কাজ এই শোতেই শেষ ছিল।


 

০২.

আগের সেমিস্টারেই আমাদের কানে গুজব আসছিল ‘০৮ থেকে কোর্স রেজিস্ট্রেশন ফি বাড়ানো হবে। আমাদের সময়ে কোর্স রেজিস্ট্রেশন ফি ছিল প্রতি ক্রেডিটের জন্য ১৬ টাকা টিউশন ফি ও পাঁচ টাকা পরীক্ষা ফি। অর্থাৎ ক্রেডিটপ্রতি ২১ টাকা করে পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে রিটেকের জন্য আলাদা কোনো ফি ছিল না। রিরিটেকের ফি ছিল কোর্সপ্রতি ৫০০ টাকা করে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ছিল, ০৮ ব্যাচ থেকে প্রতি ক্রেডিটের জন্য ৩০ টাকা করে টিউশন ফি ও ১২ টাকা করে পরীক্ষা ফি নেয়া হবে। এছাড়া রিটেকের জন্য ৫০০ ও রিরিটেকের জন্য ১ হাজার ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত ফি নেয়া হবে।

বিষয়টি আমাদের প্রবলভাবে নাড়া দিল। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ফির বিষয়টা একটু সংবেদনশীল। এর কারণে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশই ওলোটপালোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া একবার বাধাহীনভাবে ফি বাড়তে দিলে, তা বারবার বাড়তে থাকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এটা হতে দেয়া যাবে না।

২১ ফেব্রুয়ারির প্রোগ্রাম চলাকালেই বিষয়টি প্রথম নিশ্চিৎ হই আমরা। সমন্বয় কমিটির প্রোগ্রাম পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, এ নিয়ে খাজা হলের টিভি রুমে জেনারেল মিটিং ডাকা হবে। সে সময় আমরা যে কোনো আন্দোলন বা এমন কোনো ইভেন্ট, যেগুলো ভার্সিটির সবাইকে যুক্ত করা প্রয়োজন; তা নিয়ে আগে তিন হলের ও একাডেমিক ভবনের গেইটে সেন্ট্রাল জেনারেল মিটিংয়ের আহ্বান করে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে আসতাম। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন একটিভিটি পুরোদমে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিটিং হবে।

জেনারেল মিটিংয়েও সবাই একমত হলো এটা হতে দেয়া যাবে না। সিদ্ধান্ত নেয়া হলো আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষক-কর্মকর্তাকে বের হতে দেয়া যাবে না। একটার বাস আটকে ফেলতে হবে। মেইন গেইট অবরুদ্ধ করে ফেলতে হবে।

সব কিছুই পরিকল্পনা মাফিক হলো। আমরা রাস্তা আটকে বসে পড়লাম। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কোনো গাড়ি ক্যাম্পাসে ঢুকতেও দিলাম না, বের হতেও দিলাম না। মাঝখানে চিশতি স্যার বারদুয়েক এসে আশ্বাস দিয়ে গেলেন। কিন্তু ভবি তাতে ভোলার নয়। এবার আর আমরা কেউ তালি দিয়ে চলে গেলাম না। আমাদের দাবি একটাই, নতুন ফি আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নোটিস বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। নাইলে সবার বাড়ি যাওয়া বন্ধ। প্রয়োজনে সিন্ডিকেটের মিটিং বসিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে।

চিশতি স্যার বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ভিসি স্যার খুলনাতেই নেই। সিন্ডিকেটের মিটিং ডাকবে কে?

আমাদের একটাই গোঁ, অতশত বুঝি না। দাবি মানতে হবে, নাইলে ক্যাম্পাসেই সবাইকে থাকতে হবে। অবশেষে সন্ধ্যায় সিন্ডিকেটের মিটিং বসিয়ে সিদ্ধান্ত বাতিলের লিখিত ঘোষণা দেয়া হলো।

আমাদের তৎকালীন ভিসি মাহবুবুর রহমান তখন চাপে। দুদক থেকে তাকে নিয়ে অনুসন্ধাণ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে এ আন্দোলনের খবর তাকে আরো ভীত করে তুলল। আর কখনো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখেননি তিনি। ক্যাম্পাসের শেষ স্মার্ট ভিসি ক্যাম্পাস ছেড়েছিলেন লেজ গুটিয়ে।

n_a 4

কৌশিকদার তখন থিসিস শুরু হয়েছে। মাঝে মধ্যে খাবা হলে যাই। কৌশিকদার থিসিসে কামলা খাটি। ওই সময়টাতেই লিখতে শুরু করি ‘পক্ষীটিকে শিক্ষিত করা হোক’। সত্যজিৎ রায়কে উৎসর্গ করা নাটকটির ডায়লগ কিছুটা ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার আদলে লেখা; ছন্দে ছন্দে। এই নাটকটা আমার চারবার রিরাইট করতে হয়েছে। প্রথম শোয়ের আগে লেখা স্ক্রিপ্টটা ছিল স্রেফ ক্যাম্পাসের পরিবেশ, কর্তৃপক্ষের নষ্টামি আর বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে। পরবর্তীতে এর গণ্ডী বাড়িয়ে জাতীয় রাজনীতির বিমূর্ত এক উপস্থাপনা করে ফেলা হয়। আমার রাজনৈতিক চেতনায় যত শান পড়বে, এ নাটকটাও ততটাই ধারালো হয়ে উঠবে।

এর পর ক্লাস শুরু হলো। আমি আমার ক্যাম্পাস জীবনের সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা করেছি এই টু-ওয়ান টার্মে। ক্লাসও করতাম। আবার রাতে গিয়ে কৌশিকদার থিসিসের কামলা খাটতাম। আমার কাজ ছিল মূলত রিপোর্ট লেখা। এছাড়া মডেল বানানোর কাজেও কামলা খেটেছি। এর মধ্য দিয়েই পক্ষীর স্ক্রিপ্ট লিখে ফেললাম। তবে স্ক্রিপ্ট শেষ করতে সময় নিয়েছিল মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত। কৌশিকদা, শৈবালদা আর সৌরভ ভাইকে প্রথম স্ক্রিপ্ট শোনালাম। কৌশিকদা বললেন, তুলে ফেল। সমস্যা হলো কাদের নিয়ে করব। আর্কিটেকচারের থিসিস চলে। সবাই থিসিস নিয়ে ব্যস্ত। অন্যদিকে ব্যাডের আমরা আছি চারজন। লরা আপু ততদিনে শুধু একাডেমিতেই মনোনিবেশের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। কায়েস ভাই হাইবারনেশনে। আমাদের আরিফ ভাই ওরফে ফাম তখন ফুটবলের ম্যানেজারি নিয়ে ব্যস্ত। ০৬ এ সাগর ও রাজু থাকলেও, ওরাও নিজেদের ডিসিপ্লিনের ইন্টার্নাল ঝামেলায় আটকা পড়ে আছে। কৌশিকদা-শৈবালদাদের জিজ্ঞেস করলাম, ভাই কি করব? বলল নতুন পোলাপান রিক্রুট কর। সেদিনই রাতে নিরালায় গেলাম। পরদিন ব্যাড ০৭ এর একগাদা পোলাপান নৃ-নাট্যে হাজির। ইমতিয়াজ (ইউআরপি), ইমতিয়াজ (ব্যাড), শশী, আশিক, আনন্দ, সাইফুল (ব্যাড’০৭), শোভন (আর্কি’ ০৭) এবং আমি এই আট জনে মিলে নাটকটা তুলে ফেললাম। ঠিক করা হলো, ২৬ মার্চের সেন্ট্রাল প্রোগ্রামে নাটকটা তোলা হবে।

n_a 5

ততদিনে ওয়ান-ইলেভেন ঘটে গেছে। ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীনের চাপে রাজনৈতিক দলগুলো দিশেহারা। মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যোগ হয়েছে সংস্কারপন্থীরা। আর সবখানের মতো আমাদের ক্যাম্পাস প্রশাসন তখনো বিএনপি-জামাতপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, তারাও তীব্র চাপের মুখে। অর্থাৎ ক্যাম্পাসের প্রশাসনও তখন দুর্বল হয়ে আছে। এর ওপর নানা ইস্যুতে আমরা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও প্রশাসনকে ব্যাপক চাপে রেখেছি। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রোগ্রামে ক্যাম্পাস ফাঁকা ছিল বলে বিষয়টা সেভাবে চোখে পড়েনি। কিন্তু ২৬ মার্চের প্রোগ্রাম করতে গিয়েই আমরা বুঝে ফেললাম, প্রশাসনকে চাপে রাখার এখনই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ কারণে ২৫ হাজার টাকার বড় বাজেটে প্রোগ্রাম নামাতে আমাদের কোনো সমস্যাই হয়নি।

ক্যাম্পাসের তরুণ তুর্কীরা আমরা তখন মেইনস্ট্রিমের লিড নিতে শুরু করেছি। আমাদের চিন্তাভাবনা তখন একটাই, ক্যাম্পাসের পরিবেশ পুরো বদলে দিতে হবে। সেবারই প্রথম ক্যাম্পাসে তিন দিনব্যাপী প্রোগ্রাম হলো। ছাত্রী হলের রাত আটটায় গেট বন্ধ করে ফেলার ধারাটাকে বদলে দিতে হবে এ রকম চিন্তায় সেবার আমরা প্রথম দিনের একটা সেশন চালিয়েছিলাম রাত ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত। সে রাতে ব্যাড আর ইউআরপি ০৭ এর পোলাগুলা ভৈরবীর হয়ে প্রথম মঞ্চে উঠেছিল। স্বাধীনতার গান নিয়ে। ভৈরবীর মূল প্রোগ্রাম ছিল পর দিন। তৃতীয় দিনে উঠল নাটক, ‌’পক্ষীটিকে শিক্ষিত করা হোক’।

আগেই বলেছি, পক্ষীর প্রথম শোয়ের স্ক্রিপ্ট ছিল স্রেফ ক্যাম্পাসের পরিবেশ, কর্তৃপক্ষের নষ্টামি আর বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে। ওই প্রদর্শনীটি ছিল আমাদের জন্য বড় এক নৈতিক বিজয়। নাটক দেখে পরদিন আমাদের ডিসিপ্লিনেরই এক শিক্ষক ‘০৭ এর ক্লাসে গিয়ে একগাদা কাগজ ছুঁড়ে বলেছিলেন, তোমরা বেশি বোঝো। আমি তোমাদের ক্লাসে আসব, নোট দেব আর চলে যাব। তোমরা বেশি বোঝো। তোমাদের ক্লাস নেয়া যাবে না।’

আরো অনেক জায়গা থেকেই রিএকশন পেয়েছিলাম। কিন্তু এখন যেটা বললাম, এটাই ছিল সবচেয়ে বেশি আনন্দদায়ক।

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s