নৃ- কল্প; মাতৃভাষা সংখ্যা, বর্ষ ৫ সংখ্যা ২২

মাতৃভাষা সংখ্যা, ফেব্রুয়ারী ২০১৮

nree kolpo

কবর নাটকের প্রাসঙ্গিকতাঃ রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণ

মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি নানা কারণেই আমাদের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্যকর্মগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি কারাগারের আলো আঁধারিতে আট-দশটা হ্যারিকেনের আলোয় সর্বপ্রথম মঞ্চায়িত হয় নাটকটি, প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালের আগস্টে, দৈনিক আজাদে। প্রকাশের পর থেকে গত ছয় দশকে দেশের অনেকগুলো নাট্যদল নাটকটির অসংখ্য প্রদর্শনী করেছে। ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে এতোটা প্রভাববিস্তারী সাহিত্যকর্ম আর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

মুনীর চৌধুরী ছাত্রজীবন থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়। ১৯৫০ সালে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পান। কর্মজীবনেও তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন এবং ভাষা আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েন। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে যান। পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে প্রতিবাদ সভা আয়োজন করতে গিয়ে গ্রেফতার হন এবং চাকরিচ্যুত হন। বন্দি অবস্থায় কারাগারে বসে তিনি রচনা করেন একাঙ্কিকা ‘কবর’, কারাগারের ভেতরেই প্রথম মঞ্চায়িত হয় নাটকটি।

প্রকাশের পর থেকেই ‘কবর’ নাটকটি বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি সংগ্রামের একটি অপরিহার্য হাতিয়ার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামে ‘কবর’ নাটকটি কণ্ঠস্বরের ভূমিকা রেখেছে। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত হলেও নাটকটি পেয়েছে সর্বব্যাপী রূপ। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাঠামো নাটকটিতে ফুটে উঠতে দেখা যায়। ‘কবর’ নাটকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক সম্ভবত রাষ্ট্রের চরিত্র বিশ্লেষণ। রাষ্ট্রের এই চরিত্র সার্বজনীন এবং তা ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে আমাদের সামনে নগ্নভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি আমরা। ‘কবর’ নাটকে ইনস্পেক্টর হাফিজের সাথে নেতার সম্পর্ক যেন রাষ্ট্রের রাজনীতি আর প্রশাসনের মধ্যকার সম্পর্ককে নির্দেশ করে। মুর্দা ফকির প্রতিনিধিত্ব করেন সেই মানুষদের যারা সবসময় অবদমিত হয়েও স্বপ্ন দেখে। সে স্বপ্ন দেখে কবর থেকে মুর্দারা উঠে আসবে, ক্ষমতাসীনদের পরাজিত করবে। কবর থেকে উঠে আসা ছায়ামুর্তিগুলো যেন শাসকশ্রেণির ভেতরে চাপা পড়ে থাকা ভয়ের বহিঃপ্রকাশ, যে ভয়কে তারা মাটি চাপা দিয়ে মুছে ফেলতে চায়। আসলেই পারে কি? ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা অসংখ্য বুদ্ধিজীবীকে হত্যা অথবা গুম করে ফেলতে দেখি। নয় মাস সংগ্রামের পর স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। আশ্চর্যজনকভাবে দেখি উপমহাদেশের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক দর্শনের উপর ভিত্তি করে গঠিত  রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিপীড়ক চরিত্রকে ত্যাগ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই এদেশে বিনা বিচারে রাষ্ট্রীয় হত্যা-গুম-খুন চলতে থাকে, ১৯৭৫ সালে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডের কথা প্রচারমাধ্যমে স্বীকার করা হয় সর্বহারা নেতা সিরাজ সিকদারকে হত্যার মধ্য দিয়ে। এরপর বিভিন্ন সময় নকশাল বা চরমপন্থী নিধনের নামে অসংখ্য মানুষ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিহত হন। এর কিছু কিছু প্রচারমাধ্যমে এলেও অধিকাংশই থেকে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে।

১৯৭০-৭১ সাল জুড়ে ভারতে বিনা বিচারে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে তরুণদের নির্বিচারে হত্যা করা হয় নকশাল দমনের নামে। কলকাতা শহরে এসময় হাজারখানেক ছাত্রকে হত্যা করে পুলিশ। ১৯৬৭ সালের ৫ মে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ছত্তিশগড় ও অন্ধ্রপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, সেই আন্দোলনকে দমনের জন্যই ইন্দিরা গান্ধী সরকার ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রীয় গণহত্যা চালায়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত ভারত রাষ্ট্রের চরিত্রের এই নগ্ন দিক আমরা পরবর্তীতেও বিভিন্ন সময়ে ফুটে উঠতে দেখি। আমরা দেখি মাওবাদী আন্দোলন দমনের জন্য ভারতীয় সেনাকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতেরই মানুষের বিরুদ্ধে! সীমান্তের এপারে, বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সেনা ব্যবহার করে পাহাড়িদের দমন করা হচ্ছে। জেনারেল এরশাদের শাসনামলে এরশাদ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করেন। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের মিছিলে সামরিক ট্রাক চালিয়ে দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে পুলিশ ও আর্মির যৌথ বাহিনী ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ পরিচালনা করে, যে অভিযানে বিনা বিচারে অসংখ্য মানুষকে চরমপন্থী সন্ত্রাসী হিসেবে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে গঠন করা হয় ‘র‍্যাপিড একশন ব্যাটেলিয়ান’ বা র‍্যাব। র‍্যাবের হাতে বিনা বিচারে ক্রসফায়ারে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা সঠিক বলা সম্ভব নয়, সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ৫৭৭ জন। প্রকৃত সংখ্যা যে কবর নাটকের লাশগুলোর মতই মাটি চাপা পড়ে গেছে, সে কথা বুঝতে সমস্যা হয় না। পরবর্তীতে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’কে অবৈধ রায় দেওয়া হলেও রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড থেমে থাকেনি। র‍্যাবের হাতে ক্রসফায়ারে নিহত মানুষের সংবাদ প্রচারমাধ্যমে আগের তুলনায় কম এলেও গুম-খুন চলছে।

রাষ্ট্র কেন বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে? কেনই বা তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো আইনি হস্তক্ষেপ ছাড়াই মানুষ মারার লাইসেন্স দেওয়া হয় সশস্ত্র বাহিনীকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে গেলে আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্রের স্বরূপ ও প্রকৃতি বুঝতে হবে, যা ফুটে উঠেছে মুনীর চৌধু্রীর রচনায়, ‘কবর’ নাটকে। ফ্রেডরিক এঙ্গেলস তার ‘পরিবার ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ গ্রন্থে রাষ্ট্রের উৎপত্তি বিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘রাষ্ট্র কোনোভাবেই সমাজের উপর চাপিয়ে দেওয়া একটি শক্তি নয়, একে ‘নৈতিক ধারণার বাস্তবরূপ বা ‘যুক্তির প্রতিমূর্তি’ হিসেবে দেখা যায় না, যেমনটা হেগেল বলেছেন। পরন্তু এটি বিকাশের একটি বিশেষ স্তরে সমাজ থেকেই উদ্ভূত, সমাজ যে নিজের ভেতরকার সমাধানহীন বিরোধগুলিতে জড়িয়ে পড়েছে এবং এমন অনপনেয় দ্বন্দে সে নিমজ্জিত তার নিরাকরণ করতে সে অক্ষম, এ তারই স্বীকৃতি।‘ পরবর্তীতে তিনি বলেছেন, ‘যে শক্তি সমাজ থেকে উদ্ভূত হয়ে তার ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে এবং ক্রমাগত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাই-ই রাষ্ট্র।‘ রাষ্ট্র সূচনার শুরু, তথা প্রাচীন গ্রিস থেকেই মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের আধুনিকতম রূপ, যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ শাসকের ভূমিকায় থেকে নিপীড়ন করবে, এই নিপীড়নই রাষ্ট্রের বুনিয়াদ। রাষ্ট্র সম্পর্কে লেনিন বলেছেন ‘রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষেই হচ্ছে এমন এক শাসন-যন্ত্রের সমতুল্য যা সমগ্রভাবে মানব সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। যখন এমন এক বিশেষ ধরণের লোক দেখা দেয় যাদের একমাত্র কাজ হলো শাসন-কর্মে নিয়োজিত থাকা, অন্য কোন কিছু নয়, আর শাসন করার জন্য যাদের দরকার দমন-পীড়নের এবং বলপ্রয়োগের দ্বারা অন্যদের ইচ্ছাকে আয়ত্ত্বে রাখার বিশেষ যন্ত্র- কারাগার, বিশেষ বাহিনী, সৈন্য দল ইত্যাদি- তখনই দেখা দেয় রাষ্ট্র।‘

লেনিনের এই বক্তব্য থেকেই আমাদের কাছে কবর নাটকের চরিত্রগুলো এবং রাষ্ট্রের চরিত্রের সাপেক্ষে তাদের অবস্থান নির্ণয় করতে পারি। রাষ্ট্র নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্যই সাধারণ মানুষের শিক্ষার চেয়ে সশস্ত্র বাহিনীর ভরণপোষণের পেছনে বেশি অর্থ খরচ করে। এবং এই শোষণযন্ত্র টিকিয়ে রাখতেই জনগোষ্ঠীর প্রায় সমগ্র অংশের কাছে ঢেকে ফেলতে চায় নিজের কালো দিকগুলো, তাই সরকারগুলো ফ্যাসিস্ট রূপ নেয়। কারণ এই শোষণযন্ত্রের অংশ হয়ে থাকা লাভজনক। ভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলে রাষ্ট্রে। এরই ফলশ্রুতিতে ঘটে রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড। ‘জীবিত থাকতে তুমি দেশের আইন মানতে চাওনি। মরে গিয়ে তুমি এখন পরপারের কানুনকেও অবজ্ঞা করতে চাও? কমিউনিজমের প্রেতাত্মা ভর করেছে, তাই মরে গিয়েও তুমি কবরে যেতে চাও না।‘ কবর থেকে উঠে আসা প্রথম ছায়ামূর্তির উদ্দেশ্যে নেতা যখন এই সংলাপ প্রদান করেন, তখন আমরা বুঝতে পারি- রাষ্ট্রকে শাসকেরা সমাজের ঊর্ধ্বে বিবেচনা করেন। রাষ্ট্রের আইন তাই হয়ে ওঠে দৈববাণী। পাশাপাশি দেখতে পাই ভিন্ন রাজনৈতিক মতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। আবার নেতা যখন বলেন, ‘কি লাভ তোমার বেঁচে, অশান্তি ডেকে আনা ছাড়া তোমার বেঁচে কী লাভ?’ তখন আমরা দেখি রাষ্ট্রের একজন পরিচালক তার নাগরিকের জীবনমৃত্যুর নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছেন! আমরা দেখি রাজনৈতিক নেতাদের কথা দিয়ে কথা না রাখার গল্প, আমরা দেখি রাষ্ট্রের প্রশাসন দ্বারা দমন-পীড়নের কদর্য রূপ। বিহার, ঝাড়খন্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ে নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে থাকা আদিবাসীদের হটাতে সশস্ত্র বাহিনীকে ‘লাইসেন্স টু কিল’ দেয় রাষ্ট্র। আবার বাংলাদেশে পাহাড়ীদের ওপর চলতে থাকে রাষ্ট্রের নিপীড়ন, তাদের জমি থেকে উৎখাত করে সেই জমিতে বাঙালী বসতি স্থাপনের ঘটনা। আর সবশেষে কবর নাটকের মতই, মাটিচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় সব সত্য।

মুনীর চৌধুরী তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমগ্র রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই প্রায় তুলে এনেছেন ‘কবর’ নাটকটিতে। রচনার সাড়ে ছয় দশক পরেও তাই নাটকটি একই রকমের প্রাসঙ্গিক, প্রাসঙ্গিক থাকবে যতদিন রাষ্ট্রীয় দমন নিপীড়ন চলবে সাধারণ মানুষের ওপর।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s