স্মৃতির ঝাঁপি


পর্ব: তিন

ক্যাম্পাসের তৎকালীন পরিবেশ ও সংগঠনগুলো


০১

হ্যাঁ! এখন মনে পড়ছে। সময়ের গল্প নাটকে একটা ভুল হয়েছিল। জিন্নার ভাষণটায় হালকা এদিকওদিক হয়েছিল। পরদিন ম্যাথ’০৩ ব্যাচের সোহেল ভাই এসে সেটা ধরিয়েও দিয়েছিলেন। আর কেউ কোনো ভুল ধরতে পারেনি। তবে ওভারঅল শো ভালো হয়েছিল।

সময়ের গল্পের পরই আমার প্রথম হীরা ভাইর সঙ্গে আলাপ হয়। এক দিন গ্রুপ কল চলাকালে হীরা ভাই শৈবালদাকে ফোন দিলেন, শৈবালদা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। পরে হীরা ভাই সেবার যেদিন খুলনা এলেন, সেদিনই আমার ঢাকা আসতে হয়েছিল। সম্ভবত পিএলের ছুটি পেয়েই চলে এসেছিলাম।

নৃ-নাট্যে আমাদের সদস্যদের মধ্যে বরাবরই চমৎকার এক বন্ধণ বজায় ছিল। এমনকি আমার মতো অনেকের ক্ষেত্রেই তা ছিল ডিসিপ্লিনের গণ্ডীর চেয়েও বেশি। মাঝেমধ্যেই সৌরভ ভাই, আসাদ ভাই আর আমি ক্যাম্পাসে লেইম লেইম সব পাগলামি করে বেড়াতাম। ওদের দুজনের প্রজেক্টে কামলাও খেটেছি। প্রয়োজনে দুজনকেই পাশে পেয়েছি। সে সময় ওই দুজনের কাছ থেকে এত চমৎকার সঙ্গ পেয়েছি, বর্ণনা করা যাবে না। আবার শৈবালদা প্রায়ই আমাকে নিয়ে কৌশিকদার রুমে বসতেন। তৈল সংকটের রিহার্সাল চলাকালে আমি, শৈবালদা আর মঞ্জুভাই মাঝে মধ্যেই ছাত্র হলের দোতলায় দুই বিল্ডিংয়ের মাঝের ব্রিজের ওপর বসে নানা পরিকল্পনা করতাম। বিশ্বজিত্দা, সাগর ভাই (আর্কি’০৪), কোপা, মারুফ ভাই সবার সাথেই চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মজাও হতো মারাত্মক। ফাম আর আমি প্রায়ই ব্যাডের ’০৪ আর ’০৬ নিয়ে ঝগড়া করতাম। সবচেয়ে জুনিয়র ছিল রেজোয়ান (আর্কি’০৭)। র‍্যাগ পিরিয়ড চলার কারণে ও ধারেকাছে ঘেঁষত না। ইউআরপির ইমতিয়াজ-নিয়াজ তখনো দলে ঢোকেনি। নারী কর্মী বলতে ছিল লরা আপু (ব্যাড’০৫), বৈশাখীদি, হৈমন্তিদি (আর্কি’০৪), নিশা (ইউআরপি’০৬) আর কাশফি (আর্কি’০৭)।

যাই হোক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন এক গুমোট পরিস্থিতি। বিএনপি জামাত তখন আর ক্ষমতায় নেই ঠিকই। গদিতে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারপরেও ক্যাম্পাসের বিএনপি জামাত সমর্থক শিক্ষকরা তখনো বেশ দাপটে। লীগ-বাম সমর্থক শিক্ষকরা একজোট হয়ে পরিস্থিতি বদলের সুযোগ খুঁজছে কিন্তু হালে পানি পাচ্ছে না। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে একের পর এক সাসপেনশনের ঘটনা ঘটছে। ডিসিপ্লিনে ডিসিপ্লিনে শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতায় শিক্ষার্থীরাও ফুঁসছে। অবশ্য এটা বরাবরই ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালের সময়টাকে উত্তাল করে ফেলার পেছনে এই সামান্য ও চিরাচরিত জিনিষটাও অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল।

এর মধ্যে আমরা যখন ওয়ান-টুতে সদ্য উঠেছি, খাবা হলে (তৎকালীন ছাত্র হল) প্রভোস্টের নেতৃত্বে একটা বড় রেইড হলো। খাজা হলে অ্যাটাচডদের তো বটেই, ছাত্র হলেও অ্যাটাচড অনাবাসিক ছাত্রদেরও সে সময় ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হয়। আমি নিজেই বেইজ্জতি হতে হতে একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। আমি তখন খাবা ১০৯ নম্বর রুমে সবে উঠেছি। রেইডের সময়টায় ঝুপড়িতে খেতে গিয়েছিলাম বলে আমাকে আর রুমে পায়নি। ওই ঘটনার পরপরই আমি খাজায় শিফট হয়ে গিয়েছিলাম। জনৈক অ্যাসিস্টেন্ট প্রভোস্ট সেদিন এক ছাত্রকে কানে ধরে উঠবস করিয়েছিলেন। পোলাপান ভয়ে হলের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে পালিয়েছিল অনেকেই। তখন অবশ্য বিষয়টা এমন হাতিঘোড়া কিছু ছিল না। হলের পেছনের গেইট, যেটা এখন বন্ধ; সেখান দিয়েই সুন্দর লাফিয়ে বের হয়ে আসা যেত। যারা বের হতে পারেনি, তাদের অনেকেই ছাদে পানির ট্যাংকির ভেতর লুকোনোর প্রয়াস নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে যায়। সহজ কথা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের তখন মানুষ বলেই গণ্য করত না। আর ছাত্র হলের সে ঘটনা ক্যাম্পাসের প্রতিটি ছেলেমেয়ের আত্মসম্মানে ঘা দিয়েছিল।

কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে প্রায়ই তখন বিভিন্ন বইয়ের তাকে তাকে শিবিরের পুস্তিকা পাওয়া যেত। এগুলো নিয়ে বারবার অভিযোগ করেও কোনো লাভ হচ্ছিল না। সবচেয়ে বেশি ফুঁসছিলাম আমরা, সংগঠনের পোলাপানরা। মাঝেমধ্যেই সংগঠনগুলোয় দুয়েকটা শিবিরের পোলাপান চিহ্নিত হতো। নৃ-নাট্য এদিক থেকে বরাবরই মুক্ত ছিল। কারণ আমাদের রিক্রুটিং হতো ব্যক্তিগতভাবে। মাঝেমধ্যে সদস্য সংগ্রহের আহ্বান জানিয়ে আমরা পোস্টার দিতাম ঠিকই। কিন্তু দেখা যেত আমাদের প্রত্যেকেই কারো না কারো মাধ্যমে এসেছে। ফলে আমাদের মধ্যে ক্ষতিকর কোনো এলিমেন্ট কখনোই ঢুকতে পারেনি।


০২

নৃ-নাট্যের সদস্যরা আমরা অচ্ছেদ্য এক বন্ধণে জড়িয়ে পড়েছিলাম। আবার এক সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল অন্য সংগঠনের ছেলেপেলের সাথেও। অন্য সংগঠনের লোকজনের মধ্যে থিয়েটার নিপুনের সাজু ভাই, সায়েম ভাই (বায়োটেক ‘০২) রনি ভাই (বায়োটেক’০৪) সায়মন, রুদ্র ভাই (বায়োটেক’০৫), তরী, সুমন (বায়োটেক’০৬), 35mm এর দ্বীপ ভাই, মিঠু ভাই (‘০৫), আবির, মিঠুন (ইউআরপি’০৬); এরাই ছিল সবচেয়ে কাছের। আমাদের ব্যাড’০৬ এর ফাহাদ ছিল 35mm -এ। আর আগেই বলেছি; বাবলু ছিল ওঙ্কার শৃণুতায়। এছাড়া কিরণ ভাই (আর্কি’০৪), আলিফ ভাই (ইংলিশ’০৪) এদের সাথেও বেশ খাতির ছিল।

এবার আসি সংগঠনগুলোর প্রসঙ্গে। সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল ১১ সংগঠনের সমন্বয়ে। এগুলো হলো- নৃ-নাট্য, থিয়েটার নিপুন, 35mm, ভৈরবী, প্রথম আলো বন্ধুসভা, ব-পাঠ, নৈয়ায়িক, রোটার‍্যাক্ট ক্লাব, কৃষ্টি, সূত্রপাত, নৈয়ায়িক ও খুলনা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটি।

নৃ-নাট্য নিয়ে এ জায়গায় বিশদ বিবরণের কোনো দরকার নেই। তারপরো বলি, এর মধ্যে নৃ-নাট্যই সবচেয়ে পুরনো সাংস্কৃতিক সংগঠন। খুবিতে রোটার‍্যাক্ট ক্লাব আর নৃ-নাট্যের জন্ম একই বছরে হলেও; রোটার‍্যাক্ট আসলে সামাজিক সংগঠন। সে হিসেবে দুটোর ঘরানা ভিন্ন। রোটার‍্যাক্ট ক্লাব সম্পর্কে পরে আসছি।

আগে থিয়েটার নিপুন। কটকা সমুদ্র সৈকতে প্রয়াত নিপুন ভাইর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে গড়ে ওঠা নাট্যদল থিয়েটার নিপুন। নৃ-নাট্য ও থিয়েটার নিপুনের পোলাপানের মধ্যে সব কিছুতেই একটা ‘আমরা আমরাই তো’ ব্যাপার ছিল। অর্থাৎ, আমার দেখা মতে; এ দুই সংগঠন কখনোই দুই লাইনে হাঁটেনি। ক্যাম্পাসে নাটকের সংগঠন বলতে সবে ধন নীলমণি এ দুটি সংগঠনই ছিল। হিসেবে দুই সংগঠনের মধ্যে রেষারেষি থাকার কথা থাকলেও চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ দুই সংগঠনের সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্য চমৎকার হৃদ্যতার সম্পর্ক বজায় ছিল। ‘০২ ব্যাচে কৌশিকদা-সাজু ভাই, ‘০৪ ব্যাচে শৈবালদা-রনি ভাই এদের সব সময় দেখেছি এক লাইনে হাটতে। থিয়েটার নিপুনে ফরেস্ট্রি ‘০৩ ব্যাচের নাসিম ভাইর কথা শুনলে বেশ রগচটা মনে হলেও তিনি কিন্তু বেশ ভালো মানুষ ছিলেন। আর আমাদের ব্যাচের ক্ষেত্রে বলতে গেলে, ক্যাম্পাসে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের তালিকায় ছিল তরী আর সুমন। নৃ-নাট্যে শুরুর দিকে আমি ছাড়া ‘০৬ বলতে ছিল সাগর, রাজু (ম্যাথ’০৬) ও নিশা (ইউআরপি’ ০৬)। সাগর আর রাজুর সঙ্গেও তরী-সুমনের চমৎকার সম্পর্ক ছিল। আর নিশাও পরে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। শিবাজি, রাহাত আর রুমন এসেছিল অনেক পরে।

দেখা যেত, নৃ-নাট্যের শোয়ের সময় থিয়েটার নিপুনের ছেলেপেলে দৌড়চ্ছে। নৃ-নাট্যের ব্র্যাকড্রপের কাপড় শর্ট, রনি ভাইকে ফোন দাও। থিয়েটার নিপুনের শোয়ে লাইট লাগবে, শৈবালকে ফোন দাও। দুই সংগঠনে ‘০৬ অর্থাৎ আমরা যখন পূর্ণরূপে সক্রিয় হয়ে উঠলাম, এ কেমিস্ট্রি আরো জমে গেল। আমরা দুই সংগঠনের পোলাপানই শোয়ের আগে একে অপরের অভিমত নিতাম, নাটক কেমন হচ্ছে। আর ক্যাম্পাসে বৃহত্তর পরিসরে কিছু করতে হলে আমি সবার আগে শেয়ার করতাম তরী আর সুমনের সাথে। অন্যদিকে সাগর আর রাজুর সবার সাথে খাতির থাকলেও, নৃ-নাট্য আর ম্যাথ ডিসিপ্লিনের বাইরে কোনো কিছু নিয়ে ওদের মধ্যে আগ্রহ ছিল কম। কাজ কারবারে, আন্দোলনে-মিছিলে থাকত; কিন্তু মাথা ঘামাত না। তবে আমরা সবাই যখন একত্র হতাম; সবাই মারাত্মক রকমের লেইম লেইম সব কাজ করে বেড়াতাম। সে সময় আমরা সারাদিন আড্ডা দিতাম। মশকরা-ফাজলামোতো চলতোই। আবার নিরালায় সুমনের বাসার সামনের গাছের আমও চুরি করেছি এক সাথে।

এক সময় তরী-সুমন আর আমার প্ল্যান ছিল; আমরা পাশ করে ঢাকায় এসে এক সঙ্গে একটা প্রোডাকশন হাউজ দেব। তরী এখন বিদেশে। আমি সাংবাদিকতায়। শুধু সুমনই সে স্বপ্নটার বাস্তবায়নের পথে আছে। ও একদিন অনেক বড় নির্মাতা হবে। হতেই হবে।

আবার থিয়েটার নিপুনের সায়মন (বায়োটেক’০৫) ছিল আমার কলেজ ফ্রেন্ড। ও ছিল প্রচণ্ড ঠাণ্ডা মাথার যুক্তিবাদী ছেলে। ও আর রুদ্র ভাইর (বায়োটেক’০৫) সঙ্গেও অনেক সিরিয়াস বিষয় নিয়ে অনেক আলোচনা হতো। আবার আলতুফালতু কাজও করেছি অনেক। একবার সায়মন, রুদ্র ভাই (ছিল কি!), তরী, সুমন আর আমি বৃষ্টির মধ্যে গিয়ে ছাত্রী হলের মেয়েদের গান শুনিয়ে এসেছিলাম। বলাই বাহুল্য, কেউ আমাদের দিকে ফিরেও তাকায়নি। উল্টো হলের যতগুলো জানালা খোলা ছিল, সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমরা কেউ কিছু মনে করিনি।

35mm এর শুরুটা হয়েছিল আর্কি’০৫ এর দীপ ভাই, ইএস’০৫ এর মিঠু ভাই আর রুদ্র ভাইসহ আরো কয়েকজন ‘০৫ এর হাত ধরে। সিনেমা নিয়ে শুরুতে তাত্ত্বিক ও কিছু কাজ করেছিল 35mm। অন্যদের কথা জানি না। কিন্তু দীপ আর মিঠুর সিনেমা নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। দীপের সেই স্বপ্ন হয়তো এখনো আছে। কিন্তু মিঠুর আছে কিনা জানি না। কিন্তু পেশাগত কারণে একদল শ্রমশোষক-খচ্চরের মাঝখানে আটকে পড়া মিঠু নিজের স্বপ্নগুলো যদি এখনো ধরে রাখতে পারে, আমি তাকে স্যালুট জানাব। সংগঠনটায় ‌’০৬ এর পোলাপান বলতে ছিল ফাহাদ, আবির, মিঠুন, মানিক আর অনি। এর মধ্যে ফাহাদতো আমাদের ব্যাড’০৬ এরই। তার ওপর শুরুতে ছিল নিরালাবাসী। সে কারণে সংগঠনে যাওয়ার আগে থেকেই ওর সাথে ঘণিষ্ঠতা ছিল। আবির আর মিঠুনের সাথে ঘণিষ্ঠতা হয়েছিল কাজ করতে করতেই।

আর্কি ‘০২ ব্যাচের মুমু আপুরা যখন ভৈরবী চালু করে, ২০০৭ সালের দিকে; প্রথম মিটিংয়েই নাম লিখিয়েছিল ৬০-৬৫ জন। যদিও কাজ করতে গিয়ে তাতে স্থায়ী হয়েছিল ১৫-২০ জন। খাজা হলে আমার রুমমেট আকিক ভাই পরে আমাকেও নিয়ে গিয়েছিল। সে সুবাদে আমি ভৈরবীরও সদস্য হয়ে গেলাম। তবে আমি কাজ-টাজ খুব একটা করতাম না। আকিক ভাই ঠেলা-গুঁতা দিয়ে যা করাতো, তাই-ই করতাম। ভৈরবীর সংবিধান কিন্তু আকিক ভাই আর আমার লেখা। ভৈরবীতে আমার মূল কাজ ছিল অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করা আর নয়তো আবৃত্তি করা। সে সময় ভৈরবীর কাজ সামলাতো আর্কি’০৪ এর নাফিসা আপু, ব্যাড’০৫ এর আকিক ভাই আর ইএস’০৬ এর কৌশিক। নৃ-নাট্যের সঙ্গে ভৈরবীরও বেশ চমৎকার সম্পর্ক ছিল। শৈবালদা আর নাফিসা আপু ছিল ব্যাচমেট। নাফিসা আপুর সাথে আমার ভৈরবীতেই খাতির হয়েছিল। কৌশিকের সাথে বন্ধুত্ব ভৈরবীতে যাওয়ার আগেই। আর আগেই বলেছি আকিক ভাই ছিল আমার রুমমেট, গাইড, বড় ভাই ও বন্ধু। সময়ের গল্পের প্রথম কয়েকটা শোয়ে মিউজিকের কাজ ছিল। আর সে সময় মিউজিকের কাজটা করত মূলত আমার বন্ধু কৌশিক ও তার দল। আমি পরে আর ভৈরবীতে খুব একটা যাইনি।

ওঙ্কার আর শৃনুতা এক সময় আলাদা দুটি সংগঠন ছিল। সম্ভবত ওঙ্কার ছিল আবৃত্তির আর শৃনুতা ছিল গানের। আমার জানায় যদি ভুল না থেকে থাকে; ২০০৪ সালে কটকা দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বা অন্য যে কোনো কারণেই হোক; সংগঠনদুটোয় একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। সম্ভবত সে শূন্যতা মেটাতে গিয়েই দুটো সংগঠন একত্র হয়ে ওঙ্কার-শৃনুতা নাম ধারণ করে। আমাদের সময় ওঙ্কার-শৃনুতায় সক্রিয় ছিল ‘০২ ব্যাচের হাসিব ভাই (গোপা) (তিনি নৃ-নাট্যেও ছিলেন), ‘০৪ ব্যাচের দ্যুতিদি, কিরণ ভাই, আলিফ ভাই, ‘০৫ এর হরে, শাফি ভাই, জাহিদ ভাই আর ‘০৬ এর বাবলু, সুমি আর পুতুল। আরো অনেকেই ছিল। কিন্তু ওঙ্কার-শৃনুতা বলতে এদেরকেই বোঝাতো। আর বোঝাতো রুমেল ভাইকে (বিজিই’০১)।

ওঙ্কার-শৃনুতা থেকে বেরিয়ে এসে আলিফ ভাই গঠন করেছিলেন বিশ্ব-পাঠ; সংক্ষেপে ‌ব-পাঠ। দার্শনিক দিক থেকে খিচুড়ি পাকানো একটা সংগঠন। একই সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদী আবার একই সঙ্গে মার্কস সাহেবের অনুসারী হওয়ারও একটা প্রচেষ্টা। বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু করতে করতে মুখে ফেনা তুলে ফেলত লোকটা। আবার হিটলারকেও আদর্শ মানতো। আবার কিউবান বিপ্লবকেও আত্মস্থ করার একটা প্রচেষ্টা ছিল। আলিফ ভাইর সাথে আমার বরাবরই ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু তিনি যে এ সংগঠনটা নিয়ে বেশি দূর যেতে পারবেন না, এটা মোটামুটি সবাই বুঝতে পেরেছিল। আমিও বুঝেছিলাম, তবে সেটা তার দার্শনিক দেউলিয়াত্ব দেখে নয়; আবেগের বহর দেখে। আমার নিজের মনমানসিকতাও তখন দার্শনিক দিক থেকে খুব একটা উঁচু মানের কিছু ছিল না। কিন্তু নৃ-নাট্যের ‘জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ-গোত্র নির্বিশেষে সেই মানুষই সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু . . .’ কথাটা বেশ ভালোভাবেই মাথায় গেঁথে নিয়েছিলাম। মানুষের সাথে আমার দেখা হয়েছে আরো অনেক পরে। আলিফ ভাইর সাথে আমার ভালো খাতিরের পেছনে কারণ ছিল একটাই; লোকটা একটু বেশি আবেগী। আমার নিজেরও তখন জাতীয়তাবাদ আর মানুষের মধ্যে বিরোধটা কোথায়, সে জ্ঞান হয়নি। তবে চোখ ফুটতেও দেরি হয়নি। ততদিনে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। আলিফ ভাইর আবেগের এই বহর আমার আর কৌশিকের মধ্যে দুরত্ব তৈরি করেছিল। আরো অনেকের সঙ্গেই করেছিল।

লোকটা কাজকারবারের দিক থেকে অনেক বেশি হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ। সিএসইর চয়ন আর ইংলিশ ডিসিপ্লিনের কিছু ছেলেমেয়েকে নিয়ে ব-পাঠ দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার মানসিক দেউলিয়াত্বই তাদের দূরে ঠেলে দেয়। কেউ কেউ আবার চলে যায় ভৈরবীতে। বেচারা কৌশিক আর ভৈরবীর এতে কোনো দায় না থাকলেও তার সব রাগ গিয়ে পড়েছিল ভৈরবীর আর কৌশিকের ওপর।

কৌশিকের সঙ্গে আমার বিরোধ হয়নি কখনোই। কিন্তু দুরত্ব তৈরি হয়েছিল। এক পাগল সিনিয়রকে প্রটেকশন দিতে গিয়ে বন্ধুত্বের মূল্য দিতে পারিনি আমি। আমি যদি চোখ বন্ধ না করে ফেলতাম, তাহলে নিশ্চিত অনেক কিছুই স্পষ্ট দেখতে পেতাম।

তবে এগুলো অনেক পরের ঘটনা। আমাদের টু-টুয়ের অর্থাৎ গোটা ‘০৬ এর থ্রি-ওয়ানের দিককার। তার আগ পর্যন্ত আমি, তরী, সুমন, আর কৌশিক সব সময়ে জমাট বাধা একটা সার্কেল ছিলাম।

সূত্রপাত ছিল ম্যাগাজিন। এটি’০৩ ব্যাচের লিটন ভাইর নেতৃত্বে পত্রিকাটার শেষ সংখ্যা বের হয়েছিল। আমাদের ব্যাড’০৫ ব্যাচের তানভীর ভাই আর এডুসহ আরো কয়েকজন এতে কাজ করেছিল। এর পর আর বের হয়নি। অনেক পরে আমাদের ক্যাম্পাস জীবনের শেষ দিকে এসে আমি আর রাহাত পত্রিকাটাকে পুনরুজ্জীবিত করার একটা প্রয়াস নিয়েছিলাম। নানা কারণে সফল হইনি।

বিতর্ক সংগঠন নৈয়ায়িকের নেতৃত্বে ছিলেন ‘০৩ ব্যাচের মিথুন আপু। আমাদের ব্যাচে তার ভালো হ্যান্ড ছিল ইউআরপির অপু। সংগঠনটা নিজের মতো করে কাজ করে যেত।

রোটার‍্যাক্ট ক্লাবের নেতৃত্বে ছিলেন কায়েস ভাই। পরবর্তীতে ম্যাথ’০৩ ব্যাচের সোহেল ভাই আর ইউআরপি’০৪ ব্যাচের উজ্জ্বল ভাই। আমাদের আবির-মিঠুন মানিকজোড় এখানেও ছিল।

খুলনা ইউনিভার্সিটি ফটোগ্রাফিক সোসাইটিও (কেইউপিএস) সে সময় বেশ সক্রিয় ছিল। সংগঠনটার সভাপতি পদ নিপুন ভাইকে ডেডিকেট করা। এ সংগঠনেরও নেতৃত্বে ছিল আর্কিটেকচারের পোলাপান। এর বাইরে আমাদের ব্যাড’০৬ এর সানিসহ আরো কয়েকজন ছিল।

প্রথম আলো বন্ধুসভা গড়ে উঠেছিল একটা পত্রিকার ফোরাম হিসেবে নয়, আমাদের শিবির বিরোধী লড়াইয়ের এক কার্যকর অস্ত্র হিসেবে। আগেই বলেছি ক্যাম্পাসে প্রেসক্লাব ছিল শিবিরের। আমরা তাতে ঢুকতেই পারছিলাম না। কিন্তু ওই লাইনের দিক থেকে আমাদের বড় শক্তি ছিল প্রথম আলোর ক্যাম্পাস প্রতিনিধি প্রতাপদা। মিডিয়া লাইনে শিবিরের কাছে মার খাওয়া যাবে না চিন্তায় অন্য সব সংগঠন থেকে দুয়েকজন করে কর্মী দিয়ে বন্ধুসভা দাঁড় করানো হয়েছিল। সম্ভবত আমাদের কৌশিকদাই ছিলেন এর প্রথম প্রধান সমন্বয়ক।

এসব সংগঠনই আমরা এক হয়েছিলাম সমন্বয় কমিটির মধ্য দিয়ে। সমন্বয় কমিটির কোনো ব্যানার ছিল না। প্রতি মাসে একটা করে সংগঠন আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করত। প্রতি সপ্তাহে একটা করে মিটিং হতো। আহ্বায়ক সংগঠনের এক-দুই জন করে প্রতিনিধি থাকত। সমন্বয় কমিটি অনেক শক্তিশালী একটা বডি ছিল। পরবর্তীতে অনেক আন্দোলনের অনেক বড় বড় ঘটনার প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়েছিল সমন্বয় কমিটির বৈঠকে। সংগঠনগুলোর কণ্ঠও অনেক জোরালো ছিলো। শুধু শিবির বা অন্যান্য রাজনৈতিক অপশক্তিকে ঠেকানো নয়, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়েও অত্যন্ত সোচ্চার ছিল সমন্বয় কমিটি। মূলত শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের বিষয়টাই ছিল মুখ্য। শিবিরসহ অন্যান্য অপশক্তি ঠেকানোর কাজটা ছিল এর অংশ।

এর মধ্য নিষ্ক্রিয় ছিল শুধু কৃষ্টি। এক পর্যায়ে সংগঠনটিতে প্রতিনিধিত্ব করার মতো কোনো সদস্যও অবশিষ্ট ছিল না। সে সময় প্রতিনিধিত্ব করার মতো কেউ না থাকায় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে কমিটি থেকে সংগঠনটিকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। অনেক পরে কিরণ ভাইর হাতে পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল সংগঠনটির।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s