স্মৃতির ঝাঁপি

 


পর্ব: দুই

এর পরেও অনুচ্চারিত থেকে গেছে অনেক কথা


০১

611_1064505767085_2997_n.jpg

স্মৃতির ঝাঁপি খোলা সত্যিই এক মুশকিলের কাজ। এক কথা বলতে গেলে চলে আসে আরো অনেক কথা। এক ঘটনার লেজ ধরে চলে আসে আরো অন্য অনেক ঘটনা। সুতরাং, আপাত দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও প্রাসঙ্গিক ঘটনাগুলোর প্রয়োজনেই অনেক অপ্রয়োজনীয় কথা বলতে হয়। আবার কিছু ঘটনা আছে, যা অপরপক্ষের সম্মতি ছাড়া বলা যায় না, সেক্ষেত্রে তা চেপে যেতে হয়। আবার এক ঘটনা চেপে রাখতে গেলে, তার সঙ্গে ধামাচাপা দিয়ে রাখতে হয় আরো অনেক কিছু; যাতে করে চেপে যাওয়া ঘটনাটায় কোনো টান না পড়ে। আমার ক্যাম্পাস জীবনটাও এমন। ২০০৬ থেকে ২০১৪ সালের শুরুর দিকটা পর্যন্ত অনেক ঘটনার সাক্ষী আমি। অনেক ঘটনার মধ্যমণিও। আবার এমনও অনেক ঘটনা আছে, যেখানে আমি প্রধান চরিত্র না হলেও; সবচেয়ে বড় অনুঘটক বা প্রভাবক; যা-ই বলা হোক না কেনো, তা-ই ছিলাম আমি। এ আট বছর কত প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক-গোপন কথা পেটে চেপে রেখে ঘুরে বেড়িয়েছি, তার কোনো হিসাব নেই!

নৃ-নাট্য নিয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গেলে আমার ক্যাম্পাস জীবনে এর বাইরের ঘটনাগুলোকেও বর্ণনা করা জরুরী। কারণ নৃ-নাট্য ক্যাম্পাসের বৃহত্তর পরিবেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, যা আমাদের সময়ে ক্যাম্পাসের পরিবেশের অনেক বড় এক প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। আবার সাংগঠনিক পরিমণ্ডলের বাইরের অনেক কিছুতেই প্রভাব ফেলেছে নৃ-নাট্য।

আমাদের ব্যাচে যেসব ছেলেমেয়ে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিল, তাদের মধ্যে আমিই সম্ভবত সবার পরে ডিসিপ্লিনের গণ্ডী ভেঙে ক্যাম্পাসের বৃহত্তর পরিবেশে সক্রিয় হয়েছিলাম। নৃপতি নাটকের শো হওয়ার কিছু দিন আগেই ক্যাম্পাসে ’০৬ ব্যাচের আগমনের বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হয়। আমাদের আর আর্কিটেকচারের তখন ওয়ান-টু সেমিস্টার চললেও, অন্যান্য ডিসিপ্লিনে আমাদের ব্যাচের ছেলেমেয়েদের তখন টু-ওয়ান চলছে। ওই বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানটা এক মজার অভিজ্ঞতা। আমার ব্যাচের প্রথম সেন্ট্রাল প্রোগ্রামে আমি কোনো অংশেই ছিলাম না। আয়োজনে তো ছিলামই না; শুধু একটা কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়েছিলাম। তাও বাবলুর ঠেলা আর জোরাজুরিতে। প্রোগ্রামের দ্বিতীয় কি তৃতীয় আইটেমে আমাদের ব্যাড’০৬ এর চাঁদ যখন মাইক সামনে বললো ‘চুপ! আমি এখন ঈশ্বরের সাথে কথা বলব. . .’; সাথে সাথে রোদেলা দুপুরে নেমে এল বিনা আমন্ত্রণের বৃষ্টি। প্রোগ্রাম বরবাদ ভেবে আমি তখন হলে গিয়ে ফোন বন্ধ করে আমাদের ’০৪ ব্যাচের মিনহাজ ভাইর বেডে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আসলে সেদিন আমি একাই এমন ছিলাম না। আরো অনেকে চলে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা মুহূর্তের মধ্যে মাঠ দর্শকশূন্য হয়ে পড়েছিল। পরে বাবলু-আবির-সুমিসহ দুয়েকজনের প্রাণান্তকর প্রয়াসে সেদিন তিন ঘণ্টার প্রোগ্রাম সংক্ষেপিত করে আধ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাও অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করে দিতে হয়। সেদিন সন্ধ্যায় চোখ ডলতে ডলতে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে এগিয়ে আসতেই বাবলু তেড়ে এসেছিল। আমি কিছু বলার আগেই ও চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘কোনো কথা কবি না . . . (প্রকাশ না করাই উত্তম)’। যাই হোক, ঘটনা বুঝতে সময় নিলাম না। কিন্তু মিজানের দোকানে গিয়ে চা আর বিড়ি খাওয়া ছাড়া আর কিছু করার ছিল না আমার তখন।

আমরা যখন ক্যাম্পাসে আসি তখন এক অদ্ভূত সময়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায়। সে সময় ক্যাম্পাসে বেশ কিছু শিবিরের পোলাপান ছিল। ওদের প্রকাশ্যে রাজনীতির কোনো সুযোগ ছিল না ঠিকই, তারপরো ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত তারা। বিশেষ করে ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাবের’ সাইনবোর্ডে ওরা ক্যাম্পাসে বেশ দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। আর কোনায় বসে ষড়যন্ত্র করত, কিভাবে ক্যাম্পাসের সংগঠনগুলোয় অনুপ্রবেশ করা যায় বা ক্যাম্পাসে রাজনীতি চালু করা যায়। এছাড়া সময়, খুলনা ইউনিভার্সিটি মুভি ক্লাব (আমার ঠিক মনে পড়ছে না, অন্য নামও হতে পারে) নামেও ওদের আরো কিছু সংগঠন ছিল। তার ওপর তখন ভিসি ছিল মাহবুবুর রহমান। চিহ্নিত জামায়াতি ও মারাত্মক স্মার্ট লোক। প্রকৃতপক্ষে সে ছিল খুবির শেষ স্মার্ট ভিসি।

ক্যাম্পাসে তখন প্রতিটি ডিসিপ্লিনের নিজস্ব শক্তিশালী সংস্কৃতি ছিল। আর এর কেন্দ্রে ছিল র‍্যাগিং সংস্কৃতি। তবে প্রথাগত বা বলিউডি সিনেমায় র‍্যাগিং বলতে যা দেখায়, সেটা কখনোই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল না। এর অস্তিত্ব ছিল শুধু সিনিয়রদের মুখে। জুনিয়রদের বয়ান দেয়ার সময় আমরা বলতাম, ‘র‍্যাগিংয়ের দেখছটা কি? র‍্যাগ হইতো অতীতে! ক্যাম্পাসের পুরনো আমলের পোলাপান যত কালপ্রিট ছিল, আমরা তো তার তুলনায় কিছুই না। না চাইতেই আমাদের মতো সিনিয়র পাইছো তো, বুঝবা না।’ প্রকৃতপক্ষে আমরা যেসব ব্যাচের সিনিয়রদের ঘাড়ে এত বদনাম চাপাতাম, তারা আসলে আরো ভদ্র ছিল।

সে যাই হোক, শিবিরের ছেলেমেয়েরা তখন ক্যাম্পাসে বেশ সক্রিয়। আশির দশক থেকে শুরু করে চলতি দশকের শুরুর দিকটা পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক হালহকিকত নিয়ে যারা বিন্দুমাত্র খোঁজ রেখেছে, তারাও জানে; শিবির কি জিনিষ। আর আমাদের ঠিক আগে যারা ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল, তারাও খুব ভালো বুঝেছিল শিবির কি জিনিষ। আমরা যেবার ক্লাস শুরু করি, সে বছর; অর্থাৎ ২০০৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে ক্যাম্পাসে বইমেলা হওয়ার কথা ছিল। তখন ডিএসএ ছিলেন আইয়াজ হোসেন চিশতী স্যার। সে বইমেলা আয়োজন করার কথা ছিল ক্যাম্পাসের সাধারণ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর। কিন্তু যখন ডিএসএ দপ্তর থেকে আয়োজক সংগঠনগুলোর তালিকা প্রকাশ করা হলো, দেখা গেল ওর মধ্যে প্রেস ক্লাব, সময়; এসব সংগঠনেরও নাম রয়েছে। সাধারণ সংগঠনগুলো বেঁকে বসল। আমরা এদের সাথে প্রোগ্রাম করব না। ডিএসএ অফিসও তার অবস্থানে অনড়। আমরা প্রোগ্রাম বয়কট করলাম। সে প্রোগ্রাম উঠেছিল ঠিকই। কারণ তখনও স্টেজলোভী ছেলেমেয়ে ছিল। তফাৎ শুধু এই, কর্তৃপক্ষের চোখে একটু হলেও পর্দা ছিল। কারণ মানহীন সে প্রোগ্রামের পর ডিএসএ অফিস বুঝে গিয়েছিল, কাদের দিয়ে কি করানো সম্ভব; আর কাদের দিয়ে কি করানো সম্ভব না। এর পর থেকে ডিএসএ অফিসের সাথে আমরা ত্যাড়ামি করলেও, ডিএসএ অফিস আমাদের সাথে ত্যাড়ামি করত না।

611_1064506887113_3895_n.jpg

সে প্রোগ্রামের কিছু দিন পরই ক্যাম্পাসে শিবিরের পোস্টার পড়ল। এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এজন্য শিবিরের পাণ্ডাগুলোর কাউকেই ডাকা হলো না। সাসপেন্ড হলো আমাদেরই কোনো এক সংগঠনের দুই বড়ভাই। বিষয়টাকে আমাদের সিনিয়ররা খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছিল। কারণ বিষয়টি আসলেই ছিল ক্যাম্পাসের সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। প্রকৃতপক্ষে তা আসলে যুদ্ধ ঘোষণাই ছিল। এই এক ঘটনা ক্যাম্পাসের নয়টা সংগঠনকে এক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছিল। ‘খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সমন্বয় কমিটির’ ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হলো সংগঠনগুলো। আমরা তখনো দৃশ্যপটে অনুপস্থিত। সবে ক্যাম্পাসে ঢুকেছি। আর আমাদের ইমিডিয়েট সিনিয়র ব্যাচ ’০৫ এর কিছু পোলাপান তখন মাত্র সক্রিয় হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে টিআইবির একটা দুর্নীতিবিরোধী প্রোগ্রাম নামল। তাতে নৃ-নাট্যেরও নাটক ছিল। সম্ভবত গণশত্রুর শো হয়েছিল। সে সময় একটা ঘটনা ঘটেছিল। সেটা আমি এখানে চেপে গেলাম। নিজেদেরই স্বার্থে।

মূল টাইমলাইনে ফিরে আসি। আমরা ও আর্কিটেকচারের ’০৬ যেবার ওয়ান-টুতে; অর্থাৎ বাকি ’০৬ টু-ওয়ানে; ক্যাম্পাসে তখন সাসপেনশন ঝড় শুরু হয়েছে। শিবির আর ছদ্মলীগারদের উস্কানিতে প্রচুর কমপ্লেইন হয়েছে তখন। বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে দলে দলে ’০৬ সাসপেন্ড হয়েছে তখন। ’০৫ আর ’০৪ এরও অনেকে সাসপেন্ড হয়েছে। এবং সবাই বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ক্রিম ক্রিম ছেলেমেয়ে। শিবির আর লীগারদের হিসাব ছিল, ক্যাম্পাসে ডিসিপ্লিন সংস্কৃতি চালু থাকলে, তারা প্রকাশ্যে চালু হতে পারবে না কখনোই। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের হিসাব ছিল, ব্যাচগুলার মাজা ভেঙে দেয়া গেছে। প্রকৃতপক্ষে, তারা আমাদের তখন আরো উস্কে দিয়েছিল। আমার দেখা ক্যাম্পাসে সবচেয়ে বুনো, লাগামছাড়া, উদ্ধত, গোঁয়ার ও বেপরোয়া ব্যাচ ছিল ’০৬।

তবে ’০৫, ’০৬ ও ’০৭; এ তিনটি ব্যাচকে আমি বলব ক্যাম্পাসের দ্বিতীয় সোনালী প্রজন্ম। প্রথম প্রজন্মটা ছিল ৯৮-০২ পর্যন্ত। এত এত প্রতিকূলতা, এত এত রূপান্তর ও এত এত বিচিত্র পরিস্থিতিতে আমাদের কাজ করতে হয়েছে যে; তার বিবরণ নিয়ে বসলে সাত খণ্ড রামায়ণ ফুরিয়ে যাবে, আমাদের কথা ফুরোবে না। ক্যাম্পাসের অনেক কিছু শুরু হয়েছিল আমাদের হাত ধরে। আবার ক্যাম্পাস থেকে অনেক কিছুর নাম ও নিশানা আমরাই মুছে ফেলেছিলাম- চিরতরে।

 

০২

611_1064505687083_2343_n

নৃপতির শোয়ের পর ডিসিপ্লিনে আমরা নিজেরাও তখন মহাফ্যাসাদে। নৃপতির শোয়ের দিন আমাদের ক্লাসের ছেলেমেয়েরা গিয়েছিল ’০৭ এর ক্লাসে। খবর পেয়ে ডিসিপ্লিন হেড মামুন স্যারসহ কয়েকজন শিক্ষক সেখানে এসে পোলাপানের নাম রোল নিয়ে গেলেন। কিছু হতও না। কিন্তু আমাদের ব্যাচের খচ্চর আবিরের (ইউআরপির আবির নয়, ব্যাডের আবির) নিরালায় আমাদের অনুপস্থিতিতে ঘটানো এক দুষ্কর্মের দরুণ সেটাই অনেক বড় অপরাধ হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি হলো। আমাকেও ফাঁসানোর একটা প্রয়াস নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নৃ-নাট্যের শোয়ের কথাটা তদন্ত কমিটির সদস্য কিংকু স্যারের জানা ছিল বলে রক্ষা। গোটা ওয়ান-টু আমাদের কেটেছে এ ঘটনায় কি ঘটে তাই নিয়ে উদ্বেগে। তবে এর রেজাল্ট পেতে পেতে আমাদের টু-ওয়ান লেগে গিয়েছিল। সেটা তখনকার বর্ণনাতেই চলে আসবে। তবে এ ঘটনার গুরুত্ব অন্যখানে। সেটা হলো, এ ঘটনাটি আমার সামনে পরিষ্কার করে দেয়; বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কখনোই চায় না; ছেলেমেয়েরা ঐক্যবদ্ধ থাকুক। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভাঙন ধরানোর জন্য প্রশাসন কতটা নিচে নামতে পারে বা কি কি ধরণের প্রয়াস নিতে পারে, তার একটা ধারণা আমি সে সময় পেয়েছিলাম।

এর মধ্যে ডিসিপ্লিনের কুয়াকাটা ট্যুরে গিয়ে আমিও নিজেও আরেক ঘটনায় ফেঁসে গেলাম। তবে এ ঘটনায় আমরা অভিযুক্তরা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করেছিলাম বলে বেঁচে গিয়েছিলাম। এর একটা সুবিধাও হলো; আমি তদন্ত কমিটি ফেস করা, নিজের নার্ভ শক্ত রেখে কথা বলা এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কখন কোন টোনে কথা বলতে হয়, শিখে গেলাম। আর এ কৃতিত্ব সম্পূর্ণই আশিক ভাইর।

২০০৭ সালের ডিসেম্বর এগিয়ে আসল। ততদিনে আমাদের টু-ওয়ান শুরু হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সারা দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ছাপ তখন আমাদের শিক্ষাজীবনেও। টার্মগুলো অতিমাত্রায় লম্বা হয়ে যাচ্ছে। অতএব আমরা ওয়ান-টুতেই। ষোলোই ডিসেম্বরের প্রোগ্রাম করব আমরা। আমরা বাজেট দিলাম ১৬ হাজার টাকার। ডিএসএ মঞ্জুর করল ৭ হাজার। বড় তিন দিনব্যাপী প্রোগ্রাম হবে। তাই অনেক চিল্লাচিল্লি করে তা ১২ হাজারে তোলা গেল। ডিএসএ খুশি, আমরাও খুশি। এখন অনেকের কাছে অবাস্তব মনে হবে। কিন্তু তখন একদিনের প্রোগ্রামে ৫ হাজার টাকার বাজেট পেলেই আমরা আনন্দে ধেই ধেই করে নাচতাম, আর চিশতি স্যারের দীর্ঘায়ূ কামনা করতাম। যাই হোক, সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানসূচী চুড়ান্ত করা হলো। নৃ-নাট্য ও থিয়েটার নিপুন, দুই দলই প্রোগ্রামের জন্য নাটক রেডি করে রেখেছে। আমরা তুলব রশীদ হায়দারের ‘তৈল সংকট’, আর থিয়েটার নিপুন তুলবে ‘যুদ্ধ-স্বাধীনতা’। দুটো নাটকেরই উদ্বোধনী প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল তখন। অডিটোরিয়াম বরাদ্দ নেয়ার দায়িত্ব নিল থিয়েটার নিপুন। তখন ক্যাম্পাসে ইনডোরে নাটক করার একটাই জায়গা। দ্বিতীয় একাডেমিক ভবনের চারতলার ভাঙাচোরা ফালতু সেমিনার হল, যেটাকে আসলে অডিটোরিয়াম বলে আমাদের বুঝ দেয়া হতো। বায়োটেক’০২ ব্যাচের সাজু ভাই গেলেন লাইফ সাইন্সের তৎকালীন ডিনের কাছে। ভদ্রলোক এখনো ক্যাম্পাসে আছেন, তাই তার নাম বলছি না। তিনি তেড়ে আসলেন সাজু ভাইর দিকে। বললেন, ‌ “নাটক করবা? হবে না। নাটককি তোমাদের সিলেবাসে আছে”? সাজু ভাই থ মেরে গেলেন। তিনি ডিএসএর অনুমতিপত্রও দেখালেন। তৎকালীন ডিন সাহেব বললেন, “আমি কোন‌ো ছাত্র নেতার সুপারিশ শুনব না।’’

এর পর সাজু ভাই রেগেমেগে বেরিয়ে এলেন। সেদিনই সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে তিনি পুরো ঘটনা সবাইকে জানালেন। সে সময় সমন্বয় কমিটির বৈঠকে সংগঠনগুলোর মাথারাই বসত। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সম্ভবত শৈবালদার সঙ্গে রিহার্সাল শেষে এক সঙ্গে কোনোদিক যাচ্ছিলাম। কৌশিকদাকে দেখে আমরা কিছু একটা বলতে থেমেছিলাম। অথবা কৌশিকদাই আমাদের সেখানে ডেকেছিলেন। আমি এর আগে কোনোদিন সমন্বয় কমিটির বৈঠকে যাইনি। তো যাই হোক, সাজু ভাই তখন উত্তেজিত স্বরে ডিনের সঙ্গে তার কথোপকথনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। সেদিনের বৈঠকে কৌশিকদা আর সাজু ভাই ছিলেন সবচেয়ে সিনিয়র (’০২)। সেদিন আমাদের পরবর্তী করণীয় কি, সেখানেই ঠিক হয়ে গেল। কৌশিকদা এর মধ্যে আমার আর শৈবালদার সঙ্গে কথা বলে শিওর হয়ে নিলেন, আমরা সত্যিকার অর্থেই বাইরে নাটক করতে চাই কিনা। কারণ তাহলে আমাদের একেবারে আনকোরা নতুন প্রোডাকশন নামাতে হবে। কারণ তৈল সংকট বা গণশত্রু অডিটোরিয়ামের বাইরে তোলার মতো নাটক না। শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে (এখন মুক্তমঞ্চ নামে যে ঘোড়ার ডিমটা বসিয়ে রাখা হয়েছে, সেটা তখন ছিল না) বাঁশ আর কাপড় দিয়ে বানানো মঞ্চে এর উপযুক্ত সেট তৈরি অসম্ভব। নৃপতির শো গিয়েছে বেশিদিন হয়নি। অতএব তোলা তিনটি নাটকের কোনোটিই করা সম্ভব নয়। সুতরাং, কোনো নতুন নাটক নামানোই যুক্তিসংগত। কৌশিকদা শৈবালদাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘সম্ভব’? শৈবালদা তখন আশেপাশে তাকানোর মতো অন্য কেউ ছিল না; তাই আমার দিকেই তাকিয়ে বললেন ‘সম্ভব’? আমিও অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করেই বলে দিলাম ‘সম্ভব’। শুনে কৌশিকদাও নিশ্চিন্ত স্বরে বলে দিলেন, ‘নৃ-নাট্য নাটক করবেই’।

সমন্বয় মঞ্চের মিটিংয়ে সেদিন আরেকটা বিষয় স্থির হলো, আমরা পরদিন থেকেই সংগঠনগুলো ছয় দফা দাবিতে আন্দোলনে নামব। দফাগুলোও ঠিক হলো। ঠিক হলো আগে এগুলোর সপক্ষে গণসাক্ষর সংগ্রহ করা হবে। দফাগুলো ছিল-

০১. বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য একটি করে নতুন হল স্থাপন করতে হবে। (এ দাবি বাস্তবায়ন হতে অনেক বছর সময় লেগেছিল, যার সুফল প্রথম পেয়েছিল সম্ভবত ’১৩ বা ’১৪ ব্যাচ)।

০২. অবিলম্বে ক্যাম্পাসে একটি মুক্তমঞ্চ স্থাপন করতে হবে। (এর কাজ শুরু করতে কর্তৃপক্ষের আরো তিন বছর লেগেছিল)।

০৩. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেকার সম্পর্কোন্নয়ন ও ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য টিএসসি নির্মাণ করতে হবে।

০৪. ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য স্থাপন করতে হবে। (মুক্তমঞ্চ ও ভাষ্কর্যের জন্য আমাদের আরো বৃহৎ পরিসরে আন্দোলন করতে হয়েছিল।)

০৫. অডিটোরিয়ামের নিয়ন্ত্রণভার ডিএসএর হাতে দিতে হবে। (এটা আসলে পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলেও, এর পর থেকে ডিএসএর সুপারিশ থাকলে লাইফ সাইন্স স্কুল থেকে কোনো আপত্তি জানানো হয়নি। পরবর্তীতে এমনও হয়েছে ডিএসএর ফরোয়ার্ড করা চিঠি আসার আগেই আমাদের হাতে অডিটোরিয়ামের (লাইফ সাইন্স বিল্ডিংয়ের সেমিনার হল) চাবি দিয়ে দিয়েছে।

০৬. লাইফ সাইন্সের ডিনকে পদত্যাগ করতে হবে। (এটা আসলে দেয়ার জন্য দেয়া। প্রয়োজন হলে পরবর্তী প্রেশার দেয়ার কাজে যাতে ইস্যুটাকে কাজে লাগানো যায়।)

সেদিন খাজা হলে ফিরতে ফিরতে আমি আর শৈবালদা ভাবছি, ‘বিষয়টা কি হলো? খুব তো বড় মুখ করে বলে এলাম সম্ভব। এখন কৌশিকদারে তো বলাও যাবে না, আমরা আসলে হুতাশে কথা দিয়ে ফেলেছি’।

তবে শৈবালদা খাবা হলে ফিরে যাওয়ার আগে বলে গেল, ‘তোর উপর আমার বিশ্বাস আছে বাপ্পী। তুই পারবি’। আমিও স্বভাবসুলভ আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললাম, ‘হ ভাই। পারুম। টেনশন নিয়েন না’। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভেতরটা তখন আমসি হয়ে আছে।

পরদিন সকালে আমি আর শৈবালদা দাঁড়ালাম আমাদের ১ নম্বর ভবনের সামনে। বায়োটেক ’০৬ এর তরী আর সুমন দাঁড়াল লাইফ সাইন্স বিল্ডিংয়ের সামনে। গণসাক্ষর তোলার কাজে। দুপুরের মধ্যেই আমরা আড়াই হাজার সাক্ষর তুলে ফেললাম। নগদ নগদ সেটা চলে গেল ভিসির অফিসে। আমরাও তখন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে জড়ো হতে শুরু করেছি। মাহবুবুর রহমান সাহেবও বুঝলেন লক্ষণ খারাপ। কালবিলম্ব না করে তিনি এলেন এবং বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিলেন। এবং পোলাপান হাততালি দিয়ে চলে গেল।

কৌশিকদার তখন থিসিস চলছে। দুপুরে তিনি মাঠে ছিলেন না। ভিসির সাথে কথা বলেছিল সাজু ভাই আর আর্কির মুমু আপু (’০২)। আমিও তখন আন্দোলন সফল ভেবে কৌশিকদাকে হলে গিয়ে খুঁজে বের করলাম। সব শুনে তার মুখ কালো হয়ে গেল। বললেন, ‘দেখিস এসব দাবি আদায়ের জন্য তোদের আবার আন্দোলন করতে হবে’। আরো কিছু কথা বললেন, যেগুলো পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে ফলে গিয়েছিল। আমার দেখা খুবি ক্যাম্পাসে ঠাণ্ডা মাথায় সবচাইতে নির্ভুল চিন্তা করতে সক্ষম ব্যক্তিটি ছিলেন কৌশিকদা।

216748_1014211639567_2321_n

যাই হোক, বিকেল বেলা নৃ-নাট্যের কল ছিল। সেখানে গেলাম। গিয়েই ফ্যাসাদ। আজকে তো আমার নতুন নাটকের রিহার্সাল শুরু করানোর কথা। দুম করে মাথায় একটা আইডিয়া আসল। কয়েকটা লাইন লিখে ফেললাম। এর পর কোপা (আর্কি’০৪), আসাদ ভাই (আর্কি’০৫), কাশফি আর রেজোয়ানকে (আর্কি’০৭) এক লাইনে; ফাম (আরিফ ভাই-ব্যাড’০৪), লোরা আপু (ব্যাড’০৫), মেহরাব ভাই (আর্কি’০৫) আর আমার বন্ধু সাগরকে (ম্যাথ’০৬) আরেক লাইনে দাঁড় করিয়ে ফেললাম। এর পর নিজে মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডায়লগ দেয়া শুরু করলাম ‘নিলক্ষা আকাশ নীল, আর এ নীল নিলক্ষার নিচে ছোট্টো এক টুকরো দেশ- বাংলাদেশ…’।

কোরাস আর কোরিওগ্রাফি। কোরিওগ্রাফির মধ্য দিয়ে এক গল্প ভেঙে আরেক গল্পে প্রবেশ। এপিক থিয়েটার ফরমেটে অ্যালিয়েনেশন ইফেক্ট। পুরোটাই ন্যারেটিভ। উপস্থাপনায় খানিকটা মেটাথিয়েটার ধাঁচের। এই হলো সময়ের গল্প। এ নাটক আমি নামিয়েছি ছয় দিনের রিহার্সালে। সে সময় এমনও হয়েছে ব্লকিং দিতে দিতে ডায়লগ শেষ। নতুন করে ডায়লগ লিখে আনতে হয়েছে। আমার অ্যাসথেটিক সেন্সের অভাবে মাঝখানের একটা জায়গায় স্মৃতিসৌধের কম্পোজিশন করতে গিয়ে কিছুটা মাখানো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। একেবারে হ-য-ব-র-ল দশা। সেটা আবার কৌশিকদা একটু এদিকওদিক করে ঠিক করে দিলেন।আর কৌশিকদা নাটকের যে পোস্টার বানিয়েছিলেন; এক কথায়- অসাধারণ।

19679_1332083536362_6915748_n

এর পর শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নাটকের প্রথম প্রদর্শনী চলাকালে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে খবিশ পোলাপানও মনযোগ দিয়ে নাটক দেখেছিল। অন্যদিক আমি উত্তেজনায় দুয়েকটা ডায়লগ ভুল বলে ফেললেও কেউ ধরতে পারেনি।

এখন পর্যন্ত সময়ের গল্পই নৃ-নাট্যের সর্বাধিকবার মঞ্চায়িত নাটক। প্রায় ২৫টির কাছাকাছি শো হয়েছে নাটকটির। এর পর আর এগোয়নি। কারণ অনেক পরে আমি সময়ের গল্প নাটকের স্ক্রিপ্ট প্রত্যাহার করে নিয়েছিলাম। কারণ, তাতে আমি যে ইতিহাস তুলে ধরেছিলাম, তা আসলে একটি দলের শেখানো ইতিহাস। যে ইতিহাস ব্যক্তিকেন্দ্রীক, তা আসলে কোনো ইতিহাসই নয়। কারণ ইতিহাসই ব্যক্তির জন্ম দেয়। ব্যক্তি সেখানে অনেকগুলো চলকের (variables) মধ্যে একটি মাত্র। আর শাসকের শেখানো ইতিহাস অনেক রংচং মেখে জবড়জঙ একটা কি যেন কি আকারে তোলা থাকে। গভীরভাবে অনুসন্ধাণ করতে গেলে সে ইতিহাস ভেঙে পড়ে তাসের ঘরের মতো।

19679_1332083496361_7568323_n.jpg

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s