স্মৃতির ঝাঁপি

পর্ব এক: শুরুটা সাদামাটা. . .

611_1064499686933_4130_n

০১.

আমার থিয়েটার জীবনের সূত্রপাত ২০০২ সালে। আমি তখন নটরডেম কলেজের ছাত্র। আমরা তখন গুণে গুণে ক্লাস বাং দেই। কিন্তু প্রতি সপ্তাহেই নির্ধারিত মাত্রাটা ছাড়িয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহেই আমরা তখন আবার পরিকল্পনা করি; এ সপ্তাহেই শেষ। পরের সপ্তাহে সব ক্লাস করে পুষিয়ে নেব। কিন্তু পরের সপ্তাহেও আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। প্রতি দিনই দুটো বা তিনটি করে ক্লাস বাং না দিলে পৃথিবীটা কেমন যেন শূন্য শূন্য মনে হতো।

এ রকমই এক দিন ক্লাস বাং দিয়ে কলেজের সামনে চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছি। জামাল, যে কিনা একই সঙ্গে আমার বন্ধু ও কাজিন; কথা নেই, বার্তা নেই; কোনো সম্ভাষণও নেই; এসে হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করল, ‘ওই! তুই থিয়েটার করবি?’। আমার মনে আছে, হাতের সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাঁড়তে বলেছিলাম, ‘হ, করুম।’ সেই থেকে শুরু।

এর পর ২০০৫ পর্যন্ত একটানা কাজ করে গেলাম। এর মধ্যে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলাকালেও বাসায় কাউকে কিছু না জানিয়ে মহিলা সমিতিতে গিয়ে একটা শো করেছি। (অবশ্যই দুই পরীক্ষার গ্যাপে এবং রিহার্সাল ছাড়া। পরীক্ষা না দিয়ে শো করতে গেলে আমার পিতা ঠাকুর আমাকে মহিলা সমিতির মঞ্চের ওপরে ঝুলিয়ে রাখতেন নিশ্চিত। ভাগ্যিস! তোলা ক্যারেক্টার ছিল. . .)।

থিয়েটার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লাম খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে। এর মধ্যে ফার্স্ট ইয়ার ফার্স্ট টার্মটা পুরোটাই থিয়েটার বিচ্ছিন্ন। তখন আমি সারাদিন মহানন্দে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়াতাম। (যদি বলা হয়, ঘুরে ঘুরে র‍্যাগ খেয়ে বেড়াতাম; তাহলে কথাটার গ্রহণযোগ্যতা আরো বেড়ে যায়।) সে সময় ক্যাম্পাসে নৃ-নাট্য আর থিয়েটার নিপুনের পোস্টার দেখতাম ঠিকই; কিন্তু কেন যেন যেতে মন চাইত না। কলেজের বন্ধু সায়মন থিয়েটার নিপুনে ছিল। দুয়েকবার মনে হয় এ নিয়ে কথাও হয়েছিল; কিন্তু যাওয়া হয়নি।

আমার তখন আগ্রহ ছিল ওংকার শৃণুতায়। বাবলু অনেক আগেই আগ্রহ প্রকাশ করেছিল যাওয়ার। আমিও বলেছিলাম যাব। কিন্তু যাব যাব করে আর যাওয়া হয়নি। ওদিকে বাবলু বসে ছিল আমার আশায়। কথায় যাকে কেউ হারাতে পারেনি কখনো, সেই মুখর খলবলে বাবলু যে ভেতরে ভেতরে আসলে কতটা লাজুক; সেটা আমার ধারণা খুব কম মানুষই ধরতে পেরেছে। সে সংগঠনে যাচ্ছিল না, একা একা যেতে একটু কেমন কেমন যেন লাগে। আমারো আগ্রহ ছিল, এক সঙ্গে চলে গেলাম। অনেক দিন পর খুব সঙ্কটজনক এক মুহূর্তে এই বাবলুকেই আমরা দেখতে পাব ওংকার শৃণুতার হাল ধরতে।

কিছু দিন আসা-যাওয়া করার পর একটা গ্যাপ পড়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম টার্ম তখন প্রায় শেষের পথে। ক্যাম্পাসের খইতলায় একদিন ’০৪ ব্যাচের আশিক ভাই আর কায়েস ভাইর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। আশিক ভাই জিজ্ঞেস করল, তুই কি নাটক একেবারেই ছেড়ে দিলি?

— না ভাই

— তাহলে ক্যাম্পাসে দুটো নাট্যদল আছে জানিস

— জানি ভাই

— যাসনি কেনো?

— এমনিই। যাওয়া হয়নি আর কি!

— নৃ-নাট্যে যাবি?

— এখনো ডিসাইড করিনি

— আমরা যাচ্ছি। তুই আমাদের সঙ্গে যেতে পারিস

— ওকে ভাই।

ব্যাস। সেই শুরু. . .

এখন যেখানে হাদি চত্বরের পাশে ক্যাম্পাসের বাসস্ট্যান্ড, আমার মনে আছে আমরা প্রথম দিন সেখানেই বসেছিলাম। আমাদের ডিসিপ্লিন থেকে আমরা পাঁচ জন এক সঙ্গে নৃ-নাট্যে ঢুকেছিলাম। আমি, জেনি আপু, লরা আপু (’০৫), কায়েস ভাই, আরিফ ভাই ও আশিক ভাই (’০৪)। পাশে মুজিব ভাইর দোকান ছিল। সে দোকানের চা খেতে খেতে কথা বলেছিলাম। তখন প্রধান সমন্বয়ক ছিল কৌশিকদা (আর্কি’০২)। আর শৈবালদা (আর্কি’০৪) আহ্বায়ক। মিটিংয়ে সেদিন কৌশিকদা বা মারুফ ভাই (আর্কি’০১) একজন জানতে চেয়েছিল, কেন নৃ-নাট্য করতে চাই? সবচেয়ে ফালতু জবাব ছিল আমার, ‘এমনিই’ গোছের কিছু একটা।

নৃ-নাট্য তখন সবে ঢাকা থেকে ‘গণশত্রু’ নাটকের শো করে এসেছে। পুরনো নাটক ‘নৃপতি’—এর রিহার্সেল আবার শুরুর কথা চলছে।

ফার্স্ট ইয়ার ফার্স্ট টার্মের পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। আমাদের সময়ে স্কুলগুলোর পরীক্ষা হতো আলাদা আলাদা সময়ে। আমাদের পরীক্ষা যখন চলছিল, আর্কিটেকচারে তখন ফুল স্কেলে ক্লাস চলছে। নৃ-নাট্যে তখন ২০-২২ জন আছে শুধু আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিনের। সুতরাং, ওদের কাজ চালাতে সমস্যা হলো না। পরীক্ষার পর পর আমাদের নবীনবরণ হলো। আমাদের ডিসিপ্লিনের অন্য সবাই আবার গ্রুপে জয়েন করল। কেবল আমি তখন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি।

জীবনে প্রথমবারের মতো বাড়ির বাইরে এসে শতভাগ স্বাধীনতার পূর্ণ সদ্ব্যবহার কিভাবে করা যায়, তাই নিয়ে আমি তখন দিশেহারা, উদ্ভ্রান্ত।

০২.

ঢাকা থেকে ফেরার পর কিছুদিন পার হয়েছে। আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস পর। অন্যদিকে অন্যান্য ডিসিপ্লিনের যথাসময়ে। ফলশ্রুতিতে ’০৭— এর যথাসময়ে ক্লাস শুরু করতে গিয়ে আমরা ওয়ান-টুতে উঠেই সিনিয়র। আমিও সদ্য সদ্য কাঁচা র‍্যাগ খেয়ে উঠেছি। সামনে একগাদা ০৭। সারাদিন ক্যাম্পাসে; সন্ধ্যায় নিরালায় সবখানেই আমাকে দেখা যেত কোনো না কোনো ’০৭ ধরে নিজেকে কড়া র‍্যাগবাজ প্রমাণের চেষ্টা করছি। এমনই একদিন গুইটালে বসে কয়েক জুনিয়রের সঙ্গে ‘কথা বলছিলাম’। কায়েস ভাই আর শৈবালদা কথা বলতে বলতে বিল্ডিং থেকে বের হচ্ছে। (তখন আমাদের ব্যাডের ক্লাসগুলো ছিল ১ নম্বর অ্যাকাডেমিক ভবনে। এখন ভবনটার নাম সম্ভবত সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভবন।) ভাই এসে ধরল, কিরে? তোরে নৃ-নাট্যে দেখা যায় না কেনো? আর কয়েকদিন পর নৃপতির শো, তুই জানিস? আজকে তুই অবশ্যই রিহার্সালে আসবি।

সেদিনই রিহার্সালে গেলাম। আমার দেখা নৃ-নাট্যের প্রথম রিহার্সেল। আমি মারুফ ভাইর পারফরমেন্স দেখে মুগ্ধ হলাম। এই লোকটা নিজের অভিনয় সামর্থ্যকে কাজে লাগালে অনেক কিছু করে ফেলতে পারত। কিন্তু খুবি থেকে পাশ করে বের হওয়ার পর বাস্তবতার চাপে মারুফ ভাই আর অভিনয় করারই সুযোগই পেলেন না।

যাই হোক সেদিন রিহার্সেল শেষে মিটিংয়ে সবার কথা হলো। সেট, প্রপস নিয়ে কথা বলতে বলতে আমি একটা আইডিয়া দিলাম। বিষয়টা কৌশিকদা-মারুফ ভাইদের পছন্দ হলো। তাদের এটা একটা ভালো গুণ ছিল। সবার আগ্রহকে কাজে লাগাতে পারতেন। সবার কথা শুনতেন ও আইডিয়া ভালো হলে কাজে লাগাতেন। ইন ফ্যাক্ট কৌশিকদার স্পেশালিটিই ছিল, সবার আগ্রহগুলোকে যথাসময়ে যথাস্থানে এবং সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতেন। আর মারুফ ভাই হুংকার দিতেন ঠিকই। কিন্তু সেটা হুংকারই থাকত। আর শৈবালদা! অসাধারণ নেতৃত্বগুণসম্পন্ন এই মানুষটিকে নিয়ে অল্প কথায় সব বলে দেয়া সম্ভব না।

1923488_1064493206771_6159_n

প্রথমে নাটকের কুশীলবদের মঞ্চে ওঠার কথা ছিল চিরাচরিত মেকআপ ও গেটআপে। আমার আইডিয়া ছিল, নৃ-নাট্যকে নৃ-নাট্য হিসেবেই উঠতে হবে। দর্শককে নাটকের মধ্যে হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। অতএব, রাজা-উজিরের পোশাকাদি বাদ দিয়ে সাধারণ কমন একটা গেটআপে উঠতে হবে। সে হিসেবে সাদা বা কালো একটা টিশার্ট ও কালো রংয়ের ধুতি বা ঢোলা পাজামা পরতে হবে। এবং ছেলেমেয়ে সবাই এক গেটআপে উঠবে, শুধু মেয়েরা চাইলে এক্সট্রা একটা ওড়না ব্যবহার করতে পারে। এবং ছেলেদের সবার ঘাড়ে উত্তরীয় থাকবে। একেবারে সাদামাটা গোছের কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর এক অ্যালিয়েনেশন ট্রিটমেন্ট।

Nripoti-2007; 06

আইডিয়াটা সবারই পছন্দ হয়েছিল, এটা সত্যি। কিন্তু খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার বাস্তবতায় আইডিয়াটা অতিবিপ্লবী। এবং নৃ-নাট্যের বাস্তবতায় মারাত্মক ব্যয়বহুল। আবার ধুতি সবাই পরতে পারে না। এবং ধুতি-পাজামা কেনা বা বানানোর মতো সময় তখন আমাদের হাতে ছিল না। সে জায়গায় কালো প্যান্ট পরা সাব্যস্ত হলো, আর মেয়েদের টিশার্টের নিয়মের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কারণ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলাপানের মনমানসিকতায় তখনও অতটা ম্যাচিউরিটি আসেনি। এটা বোঝা গিয়েছিল শোয়ের দিন। খেলার মাঠের মতো স্টেজ পারফরমারদেরও স্লেজ করার একটা মনমানসিকতা পোলাপানের তখন ছিল। পরে অবশ্য ঠেলাধাক্কা দিয়ে এটা বন্ধ করা গিয়েছিল।

Nripoti-2007; 04

নৃপতির প্রস্তুতিকালে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিল আর্কিটেকচারের আসাদ ভাই (‌’০৫) ও সৌরভ ভাই (‘০৪)। সে সময় আমরা অনেক অর্থহীন কাজকর্ম করে বেড়িয়েছি। সেটা আরেক গল্প। যাই হোক, ভালোয় ভালোয় শোয়ের দিন এল। নৃ-নাট্যে আমার প্রথম শোয়ে মঞ্চে আমার উপস্থিতি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। হাতে জ্ঞানবৃদ্ধের মেডেল নিয়ে মস্তকাবনত অবস্থায় নৃপতি মারুফ ভাইর সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। মারুফ ভাই সেটা নিয়ে ঝুলিয়ে দিল কোপার (রাকিব ভাই, আর্কি’০৪) গলায়। ব্যাস শেষ! এটাই আমার নৃ-নাট্যের হয়ে প্রথম শো। সে সময় আমার কল্পনায়ও ছিল না, এই নৃ-নাট্য হয়ে উঠতে যাচ্ছে আমার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, আমার যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়টার আধার।

(চলবে. . .)

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s