নৃ-কল্প; বিজয় সংখ্যা (বর্ষ-৫, সংখ্যা ২০)

 

concert 2

 


কনসার্ট ফর বাংলাদেশ


১৯৭১ এর লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমিক শহীদের রক্ত এবং মা-বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে  অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই যুদ্ধে যেমন প্রত্যক্ষভাবে বাঙ্গালীরা অংশগ্রহণ করেছিল, তেমনি পরোক্ষ ভাবে অংশগ্রহণ করেন আরো অনেকে। যুদ্ধ যে শুধু রণাঙ্গনের যোদ্ধারাই করেন তা নয়, শিল্পীরাও তাতে জড়িয়ে পড়েন। পৃথিবীর বহু শিল্পী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। আবার অনেকে শামিল হয়েছেন যুদ্ধের নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। কেউ বেধেছেন গান, কবিতা কেউবা আয়োজন করেছেন বিশাল কনসার্ট।

তেমনি ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে কিছু মহান সংগীতজ্ঞের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল  ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছিল বিপন্ন মানবতা রক্ষায় সংগীতের অবদানের নতুন ধারা – চ্যারিটি কনসার্ট। পন্ডিত রবিশঙ্কর এবং বিটসের জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত এই কনসার্টে অংশ নিয়েছিলেন মানবতাবাদী গায়ক বব ডিলান, এরিক ক্লাপটন, রিংগো স্টার, উস্তাদ আলি আকবর খাঁন, উস্তাদ আল্লারাখা সহ আরো অনেকে। এই কনসার্টটি মূলত বাংলাদেশি শরণার্থীদের জন্য করা হলেও এর ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়েছিল বহুদূর। নীতিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সমর্থন দিয়েছিল। সেই সময়ে তুমুল জনপ্রিয় কিছু গায়ক কনসার্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরেছিলেন খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেই ! সাধারণ মানুষকে নাড়া দিয়েছিল সেই কনসার্টটি। সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরীতে রেখেছিলো বিশেষ ভূমিকা।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত নির্বিচার গণহত্যার ফলে প্রায় এক কোটি শরণার্থী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়। এই বিপুল সংখক শরণার্থীদের ভরণপোষণ করতে গিয়ে ত্রাণসামগ্রীর অভাব দেখা দেয়। এছাড়াও ১৯৭০-এর ভোলা ঘূর্ণিঝড় তথা ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে অধিকাংশ বাঙালিই ছিল অসহায়।

এইসব সমস্যা নিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত বাঙালি সেতারবাদক পন্ডিত রবি শংকর তাঁর বন্ধু জর্জ হ্যারিসনের সাথে আলাপ করেন। এরই ভিত্তিতে রবিশংকর, হ্যারিসনকে আমেরিকাতে একটি দাতব্য সঙ্গীতানুষ্ঠান আয়োজনের কথা বলেন। হ্যারিসন প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং তাঁর দলের সদস্য বন্ধুদের ম্যডিসন স্কোয়ার গার্ডেনের অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানান। পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিলো।

জর্জ হ্যারিসন সর্বপ্রথমে তার প্রাক্তন দল দ্য বিটল্‌সের সদস্যদের যোগ দিতে বলেন। পল ম্যাকার্টনি সরাসরি অস্বীকৃতি জানান, কারণ তখন মূলত দলের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিলো না। জন লেনন অনুষ্ঠানে আসতে রাজি ছিলেন, কিন্তু তিনি সেসময় আদালতে তাঁর সন্তানের ব্যপারে তাঁর স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সাথে আইনি লড়াই চালাচ্ছিলেন বলে শেষ পর্যন্ত আসতে পারেননি। আর মিক জ্যাগার তখন ছিলেন দক্ষিণ ফ্রান্সে। ভিসা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তাঁর পক্ষেও আসা সম্ভব হযনি। শেষ পর্যন্ত বিটলসের একমাত্র রিঙ্গো স্টার তাঁদের সাথে যোগ দিতে সক্ষম হন। সাথে আরো যোগ দেন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রিস্টন, হ্যারিসনের নতুন দল ব্যাড ফিঙ্গারের যন্ত্রীদল ও আরো অনেকে।

কনসার্টটির শুরুতেই পণ্ডিত রবিশংকর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “প্রথম ভাগে ভারতীয় সংগীত থাকবে। এর জন্য কিছু মনোনিবেশ দরকার। পরে আপনারা প্রিয় শিল্পীদের গান শুনবেন। আমাদের বাদন শুধুই সুর নয়, এতে বাণী আছে। আমরা শিল্পী, রাজনীতিক নই। বাংলাদেশে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের পল্লিগীতির সুরের ভিত্তিতে আমরা বাজাব ‘বাংলা ধুন’।” তিনি ‘বাংলা ধুন’ নামের একটি নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন। সেটি দিয়েই আলী আকবরের সঙ্গে যুগলবন্দীতে কনসার্ট শুরু হয়েছিল। তবলায় ছিলেন ওস্তাদ আল্লারাখা এবং তানপুরায় ছিলেন কমলা চক্রবর্তী।

কনসার্ট থেকে সংগৃহীত ২৫০,০০০ ডলার বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের  জন্যে দেওয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহযোগীতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের কথা, চলমান গণহত্যার কথা, লক্ষ লক্ষ দেশান্তরী শরণার্থীর কথা, সারা বিশ্বে জানিয়েছিল এবং পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠনে  ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তিনটি রেকর্ডসহ অ্যালবাম এবং ১৯৭২ সালের মার্চের কনসার্ট নিয়ে তৈরি ফিল্ম থেকে আয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তী দশকগুলোতে এসব অর্থ দান করা হয় ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুদের কল্যাণমূলক তহবিলে। ২০০৫ সালে নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অ্যালবামের ডিভিডি। এই নতুন ডিভিডির ভূমিকায় পণ্ডিত রবিশংকর বলেছেন, ৭৫ বছরের সংগীত জীবনে যত কনসার্ট করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনের ওই কনসার্টটিই। নতুন ডিভিডিতে সাক্ষাৎকারে এরিক ক্ল্যাপটন বলেছেন, এ অনুষ্ঠান সারা জীবনের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সংগীতশিল্পী হওয়াটা যে গর্বের একটা বিষয়, তা সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম।

নেপথ্যের কারিগর

‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর প্রধান উদ্যোক্তা পন্ডিত রবি শঙ্কর। বিটলস তারকা জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে রবি শঙ্করের পরিচয় ১৯৬৬ সালে, লন্ডনে। রবি শংকরের বাদনমুগ্ধ হয়ে হ্যারিসন তার কাছে সেতারের তালিম নেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনে এদেশের মানবতা যখন ভূলুন্ঠিত, তখন বন্ধু হয়ে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন পন্ডিত রবি শংকর। তার অনুরোধে পাশে এসে দাড়ান বন্ধু জর্জ হ্যারিসন। রবি সংকরের মাধ্যমেই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে রবির যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে কনসার্টের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল জর্জ। জর্জ ও রবি বলেছিলেন বাংলাদেশের জন্য তাদের আরও কিছু করার ছিল। কনসার্টটির কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জর্জ হ্যারিসনের। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর গণহত্যা তাঁর অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে হ্যারিসনের স্ত্রী অলিভিয়া বলেছিলেন, “জর্জের কাছে শুনেছি, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংস আর হানাহানি বিপর্যস্ত করে তুলেছিল রবি শংকরকে। এ নিয়ে মনঃকষ্টে ছিল সে। অন্যদিকে নিজের রেকর্ডিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল জর্জ। সত্তরে বিটলস ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে ক্যারিয়ার গড়তে সে মনোযোগী হয়ে ওঠে। এ সময় রবিশংকর জানায়, বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহে একটি কনসার্ট করতে চায়। এ উদ্যোগে সে জর্জকে পাশে পেতে চায়।” জর্জেরও মনে হলো, এ কাজে তার নিযুক্ত হওয়া উচিত। তার ডাকে অনেকে সাড়া দেবে, একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর মাঝামাঝি সময়ে ওই কনসার্ট আয়োজন সময়োপযোগী ছিল। জর্জ তখন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, ওস্তাদ আলী আকবর, ওস্তাদ আল্লারাখা ও রবি শংকরকে নিয়ে কনসার্ট আয়োজন করে। ওই কনসার্ট দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের বন্ধন শুরু।’ ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট রোববার বেলা আড়াইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলে জগদ্বিখ্যাত এই কনসার্ট। এই কনসার্টটি দেখতে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার দর্শক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s