নৃ-কল্প; বিজয় সংখ্যা (বর্ষ- ১, সংখ্যা- ৪)

 

Capture 2

নৃকল্প; থিয়েটার বিষয়ক ভাঁজপত্র

প্রকাশনায়ঃ নৃনাট্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রথম প্রকাশঃ ১৩ মার্চ, ২০১২

সৌজন্য মূল্যঃ পাঁচ টাকা

 


বাংলাদেশের নাটকে মুক্তিযুদ্ধ


মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় অধ্যায়। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মের কাহিনী ও এর বিভিন্ন দিক তাই বারবারই উঠে এসেছে সাহিত্য, চলচ্চিত্র, গান ও নাটকসহ বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে। শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধই নয়, এর প্রাপ্তি- অপ্রাপ্তি, পরবর্তী ও পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপট নিয়েও বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে কাজের সংখ্যা নেহায়েত্ কম নয়।

বলা হয়ে থাকে, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সব চাইতে বিকশিত শিল্পমাধ্যমটি হচ্ছে থিয়েটার তথা মঞ্চনাটক। মুক্তিযুদ্ধফেরত একদল তরুণের সৃষ্টিশীল প্রচেষ্টায় মঞ্চায়িত হয়েছে একের পর এক অসাধারণ মঞ্চনাটক। আর সঙ্গত কারণেই এসব নাটকে বারবার উপজীব্য হয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের তুলনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে মঞ্চায়িত নাটকের সংখ্যা বেশি। এ পর্যন্ত মঞ্চায়িত হওয়া মুুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলোর মধ্যে যেসব নাটক দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’, ‘জয় জয়ন্তী’, ‘একাত্তরের পালা’, ‘মুখোশ’, ‘কিংশুক’, ‘যে মরুতে’, ‘বিবিসাব’, ‘সময়ের প্রয়োজনে’, ‘কথা ৭১’, ‘খারন্নি’, ‘বলদ’ ইত্যাদি। এছাড়া ‘নুরলদীনের সারাজীন’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ প্রভৃতি নাটক ঠিক মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে না হলেও; এগুলো মুক্তিযুদ্ধের নাটক হিসেবেই বিবেচিত।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে সফল ও আলোচিত নাটকগুলোর অন্যতম সৈয়দ শামসুল হকের ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’। আঞ্চলিক ভাষায় রচিত কাব্যিক সংলাপ নাটকটির সবচেয়ে বড় সম্পদ। সৈয়দ হক নাটকটি রচনা করেছিলেন ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে। পরের বছরের ২৫ নভেম্বর আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশনায় ‘থিয়েটার’ নাট্যদল মহিলা সমিতির মিলনায়তনে প্রথমবারের মতো নাটকটি মঞ্চায়িত করে। কাব্যনাট্য নাকি গীতিনাট্য— এ নিয়ে দ্বন্দ থাকায় সে সময় দলটির অনেক সদস্য নাটকটি মঞ্চায়িত করার পক্ষপাতি ছিলেন না। তা সত্ত্বেও আবদুল্লাহ আল মামুন, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসি মজুমদার প্রমুখ মিলে নাটকটির কাজ শুরু করেন এবং সফলভাবে মঞ্চায়ন করেন। সৈয়দ শামসুল হকের আরেকটি অসামান্য স্ক্রিপ্ট ‘নুরলদীনের সারা জীবন’। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে এ কাব্যনাটক রচনা করেছিলেন তিনি। আলী যাকেরের নির্দেশনায় নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় ১৯৮২ সালের ২৭ ডিসেম্বর; মহিলা সমিতির মঞ্চে। ১৮৭৩ সালের প্রেক্ষাপটে কৃষক নেতা নুরলদীনের সংগ্রাম ও এর মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কে সুতোয় গেঁথে নাটকটি রচনা করেছিলেন সৈয়দ হক। ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ নিঃসন্দেহে বাংলা নাটকের ইতিহাসে অসামান্য একটি মাইলফলক। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি জনপ্রিয় নাটক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর ‘একাত্তরের পালা’। ১৯৯৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর তার নির্দেশনাতেই নাট্যদল ‘থিয়েটার’ প্রথম মঞ্চায়ন করে নাটকটির। দেশে এখন পর্যন্ত ৭০-৮০টি নাট্যদল নাটকটির মঞ্চায়ন করেছে। আবদুল্লাহ আল মামুন রচিত ‘বিবিসাব’ নাটকটি জামালউদ্দিন হোসেনের নির্দেশনায় প্রথম মঞ্চে নিয়ে আসে ‘ঢাকা সুবচন’। পরবর্তীতে নাট্যদলটি বন্ধ হয়ে গেলে জামালউদ্দিন হোসেনের নির্দেশনাতেই নাটকটিকে আবার মঞ্চে ফিরিয়ে আনে ‘নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল’। মামুনুর রশীদের ‘জয়জয়ন্তী’ মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক। ১৯৭১ সালে কীর্তনিয়া দলের জীবনযুদ্ধ, হিন্দুপাড়ার অবস্থা, সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাড়ি জমানোসহ সে সময়কার নানা দিক উঠে এসেছে নাটকটিতে। প্রথম মঞ্চায়িত হয় ১৯৯৫ সালে, টাঙ্গাইলের ভাসানী হলে।

মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য নাটক হলো অলোক বসু রচিত ‘ঘরামি’। মাসুদ পারভেজের নির্দেশনায় নাটকটি প্রথম মঞ্চায়িত হয় ২০০২ সালে। পরে সাখাওয়াত লিটুর নির্দেশনায় ‘নাট্যধারার’ দশম প্রযোজনাটি আবার মঞ্চে আসে ২০০৭ সালের ২৭ জুন। মুহম্মদ জাফর ইকবালের জনপ্রিয় ছোটোগল্প ‘বলদ’ অবলম্বনে গাজী রাকায়েতের নাট্যরূপ ও খ ম হারুনের নির্দেশনায় ‘থিয়েটার আরামবাগ’ তাদের ২৬তম প্রযোজনা হিসেবে ‘বলদ’ মঞ্চে আনে ২০০২ সালের ২২ অক্টোবর। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার লোভী, চাটুকার ও কাপুরুষ রাজাকারদের নিয়ে রচিত গল্পটির নাট্যরূপ বেশ প্রশংসিত হয়। জহির রায়হানের ছোটোগল্প ‘সময়ের প্রয়োজনে’ অবলম্বনে মোহাম্মদ বারীর নাট্যরূপ ও নির্দেশনায় থিয়েটার আর্ট ইউনিটের দশম প্রযোজনা ‘সময়ের প্রয়োজনে’ মঞ্চে আসে ২০০৫ সালের ২৪ জুলাই মহিলা সমিতি মিলনায়তনে। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি নাটক পালাকারের ‘রাইফেল’। নাটকটির শিল্পমান বেশ প্রশংসিত। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো অনেকগুলো নাটক রচিত হলেও শিল্পমানের বিচারে এগুলোর অধিকাংশ কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। শিল্পমানের চেয়ে বক্তব্যই এসব নাটকে প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। আলোচ্য নাটকগুলো ছাড়াও মামুনুর রশীদের ‘সমতট’, মমতাজ উদ্দিন আহমদের ‘কি চাহ শঙ্খচিল’, ‘রাজা অনুস্বারের পালা’, সৈয়দ শামসুল হকের ‘তোরা জয়ধ্বনি কর’, আবদুল্লাহ আল মামুনের ‘তোমরাই’, ‘দ্যাশের মানুষ’, মান্নান হীরার ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’, ‘ফেরারি নিশান’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘ঘুম নেই’, নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গণা বলছি’ অবলম্বনে ‘শামুকবাস’, শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে নির্বাচিত অংশ অবলম্বনে রচিত শ্রুতি নাটক ‘স্মৃতিসত্তা ভবিষ্যত’, হুমায়ুন আহমেদের ‘১৯৭১’, শান্তনু বিশ্বাসের ‘ইনফরমার’, সেলিম আল দীনের ‘নিমঞ্জন’ বাংলা নাটককে সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ‘নিমঞ্জন’ নাটকটির কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়। নাসির উদ্দীন নির্দেশিত এ নাটকে কেবল স্বদেশের মুক্তির আন্দোলনই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বমানবতার মুক্তির আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া যুদ্ধপূর্ব সময়ে মঞ্চায়িত হওয়া ‘এবারের সংগ্রাম’  ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নাটকদুটিও উল্লেখযোগ্য। দুটি নাটকেরই রচয়িতা মমতাজ উদ্দিন আহমদ।

বাংলা নাটকে বারবার উপজীব্য হয়ে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের মানুষের আশা-হতাশা এবং প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির খতিয়ান। আশি ও নব্বইয়ের দশকে এদেশের মঞ্চনাটকের দর্শকপ্রিয়তা ও সমৃদ্ধি অর্জনে মুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। শূন্য দশকেও মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে রচিত নাটকগুলো মঞ্চে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ এদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য উপাদান, তাই মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরো কাজ হবে, এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। সঙ্গত কারণেই মুক্তিযুদ্ধের নাটকগুলোকে বাদ দিয়ে এদেশের নাটকের ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।

 


তৌহিদ এনামের কবিতা


তীর্থগামী

তীর্থ গমনের দিন অতিক্রান্ত

ঝরাপাতায় জমাট জলজ অভিমান পর্বের

সময় ফুরিয়ে আসে

অবশেষে পদতলে গৈরিক উঠোন

অনিমেষ শরীর জুড়ে বনসাই শাল।

আমাদের জেলেপাড়া আর

তাঁতিপাড়ার পাটকাঠি মানুষেরা

অপেক্ষায় ওম দিয়ে বসে আছে চুপচাপ

বাউরি বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে

শুধু একবার একবার পা বাড়ালেই

পরজন্মে নিশ্চিত মাছরাঙা হবো।

তীর্থগামী যাত্রীরা কখনো

সোডিয়াম আলোয় স্বপ্ন দেখে না।

২০.১২.২০০২


 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s