নৃ-কল্প; তৌহিদ এনাম অপু সংখ্যা (বর্ষ- ১, সংখ্যা- ১)

নৃ- কল্প; থিয়েটার বিষয়ক ভাঁজপত্র

প্রকাশনায় : নৃ- নাট্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

 প্রথম প্রকাশ : ১৩ মার্চ, ২০১২

Capture

 

 


অপুর জন্যে


এমন নয় যে, কেবল ১৪ জানুয়ারিতে তৌহিদ এনাম অপু’র জন্মদিনে ওর কথা মনে পড়ে। কিন্তু গত কয়েকবছর যাবৎ এই দিনটাকে কেন্দ্র করে আমাদের, মানে অপুর বন্ধু-স্বজনদের কিছু কর্মকান্ড থাকে, তাই ওর নামটা উচ্চারিত হয় একটু বেশিই। এই জন্মদিন উপলক্ষেই একটি স্মারক ক্যালেন্ডার প্রকাশিত হয়, যার মাধ্যমে ১৩ মার্চে কটকা সমুদ্রে সৈকতে হারিয়ে যাওয়া আমাদের অন্য সব বন্ধুদেরও আমরা স্মরণ করি। এবছরের ক্যালেন্ডার ঠিক সময় মতো বের করা গেলোনা, শেষ মুহুর্তে ডিজাইনারের কম্পিউটার হার্ড ডিস্ক ক্রাশ করায়, পুরো কাজটাই পিছিয়ে গ্যালো আরো ক’দিন। প্রতিবছর একজন লেখকের প্রথম বই বের করবার কাজও এখনও অনিশ্চিত, কারণ তেমন পান্ডুলিপি সংগ্রহে সাফল্য আসেনি এখনো। তবু খোঁজ চলছে, হয়তো শেষ মুহুর্তে একটা কিছু পাওয়া যাবে।

কিন্তু এবার অপু’র কথা সবচে’ বেশি মনে পড়েছে অন্য একটা কারণে। অনেকদিন ধরে আমাদের ছোটকগজ ‘দ’ বের হয়নি। অনেকবার পরিকল্পনা করা হলেও হয়নি শেষমেষ। অবশেষে গতবছর নভেম্বরে ‘দ’ বের হলো। অনেক ঝামেলা বাধেই প্রকাশনার কাজগুলোতে, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু সেসব নিতান্ত গৌন মনে হয়, টাটকা পত্রিকাটা যখন হাতে পাওয়া যায় প্রেস থেকে। ‘সংবেদ’ এর পারভেজ ভাই ঈদের আগেই কয়েক কপি বের করবার ব্যবস্থা করলেন, সব প্রেস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন। পত্রিকা, বই বা ক্যালন্ডার পেলে একবার অপুদের বাসায় যাই কপি দেবার জন্যে। এবার ফকিরাপুল প্রেস থেকে বেরিয়ে মনে হলো, কাছেই গোড়ানে অপুদের বাসা হয়ে তারপর যাই,অনেকদিন যাওয়া হয়নি; পত্রিকা দেয়া হবে, ওদের বাসার লোকজনের সংগে কথাও হবে।

রিকশা চলছে কাকরাইল পেরিয়ে গোরানের দিকে, আমার ব্যাগে কয়েক কপি নতুন ‘দ’; ভালো লাগছে, বেশ ভালো লাগছে। রিকশাটা ক্রমশ ওদের বাসার কাছাকাছি পরিচিত রাস্তা ধরে চলেছে। অপুর মুখটা হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে মনে পড়তে লাগলো। মনে পড়ে গ্যালো ২০০০ সালের সেই মুহুর্তটার কথা, যখন দ’র প্রথম সংখ্যাটি বেরিয়েছিলো। আমরা তখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় বর্ষের ছাত্র। একদিন যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াতে আমাদের আড্ডা চলছে। হঠাৎ অপু ঢুকলো, মুখে দিগ্বিজয়ীর হাসি। কাছে এসে কাঁধের ঝোলা থেকে বের করলো দ’র প্রথম সংখ্যার কপিগুলো, ঝকঝকে, নতুন, সদ্য প্রেস থেকে আনা। কিন্তু পত্রিকার চাইতেও আমার বেশি মনে পড়ে ওর সেই উজ্জ্বল মুখচ্ছবি, সেই হাসিমুখ, অনেক শ্রমে মুল্যবান কিছু অর্জনের আনন্দে উদ্ভাসিত দু’চোখ..। হঠাৎ কোন এক তীব্র বেদনাবোধ যেনো আঁকড়ে ধরলো আমায়, কষ্ট হতে লাগলো, মনে হলো চোখের পানি কিছুতেই রোধ করতে পারবো না। মনে হলো কাউকে ফোন করি, কথা বলি, জানাই যে, অপু’কে কতটা মিস করি, এখনও ওর স্মৃতি কতো জ্বলজ্বলে;মনে হলো জিজ্ঞেস করি যে, কেনো কাউকে চলে যেতে হয় এমন হঠাৎ করে? কেনো বন্ধু বিয়োগের ব্যাথা সহ্য করতে হয় মানুষকে? কেনো অপুকেই চলে যেতে হলো?…জানি এসব প্রশ্নের উত্তর হয় না, প্রয়োজনও নেই। সকল ঘটনার পেছনের কার্য-কারণ আমারা কি মেলাতে পারি আমাদের ক্ষুদ্র জীবনে? মহাকালের প্রেক্ষাপটে সবকিছু হয়তো আরো বৃহৎ কোন তাৎপর্য বহন করে। প্রমোজ ভাইকে ফোন করেছিলাম কিন্তু কথা বলতে পারিনি কিছু, কেবল কষ্টটাই সংক্রমিত করতে পেরেছিলাম। এসএমএস পাঠিয়েছিলাম অভীক ভাইকেও।

দ’র প্রথম সংখ্যা প্রকাশনার সাথে তখন আমার তেমন কোন সম্পৃক্ততাই ছিলো না, আমি ব্যস্ত ছিলাম পুরোপুরি নৃ-নাট্য নিয়ে। দ ছিলো সত্যিকার অর্থে অভীক ভাই আর অপুর ভালোবাসার আর কাজ করবার জায়গা। আমাকেও পরে ওরাই ডেকে নেয়, লেখা দিতে বলে, এবং দ’র সূত্রেই প্রথম লেখালেখির শুরু।

তাই আশ্চর্য নয় যে, এবারের সংখ্যাটি হাতে নিয়ে অপুদের বাসার উদ্দেশ্যে যেতে যেতে আমার বারবার অপুর কথাই মনে পড়ে। মনে হয় যে, এই দ’টা আসলে ওরই করবার কথা, এই প্রকাশনার, নতুন দ’র কপি হাতে নেবার আনন্দ, উচ্ছাস, সবই ওর প্রাপ্য। মনে হচ্ছিলো, কারো খুব ভালোবাসার, আদরের সন্তান আমি বহন করে চলেছি, কিন্তু জনক আজ বহুদূরে, সন্তানকে পরম আদরে স্পর্শ করতে অক্ষম, যে সন্তান নিয়ে কতো পরিকল্পনা আর স্বপ্ন ছিলো তার। সেই অক্ষমতার আর অসহায়ত্ত্বের বেদনা যেন ক্রমেই আমায় গ্রাস করতে উদ্যত…।

তবু অনেক দিন পরে ‘দ’ প্রকাশের ভেতর দিয়ে তৌহিদ এনাম অপুকেই স্মরণ করা। যে প্রেরণা নিয়ে ও বেঁচেছিলো, লিখছিলো, কাজ করছিলো, স্বপ্ন দেখছিলো, জানি সেই প্রেরণার মৃত্যু নেই। অপুর জন্যে আর ওর সকল বন্ধুদের ওর জন্মদিনে নিরন্তর শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

ম. হাসান হীরা

১৪ জানুয়ারি, ২০১০

 


নৃ- নাট্য: করোটির সাম্যবাদ এবং আমরা


নৃ- নাট্য মানে শুধু একটা নাটকের সংগঠন নয়। শুধুমাত্র মননশীলতা ও রুচীশীল উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ নয়; ‘নৃ’ ধারণার মূল লক্ষ্য সমাজ, মনুষ্যত্ব ও মানবিকতা, এবং জীবনের বাস্তব সত্যগুলোর প্রতি আন্তরিক দায়বদ্ধতার সৃষ্টি। ‘নৃ’ ধারণা নিয়ে এখানে পুনঃআলোচনা আবশ্যক। ‘নৃ’ মানে মানুষ। আর এই মানুষকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সভ্যতা। মনোদৈহিক- জাতিগত- স্বত্তাগত পার্থক্য মানবসম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্রই বঞ্চিতের চেহারা এক। আর তাই মানুষের মাঝে সমতা আনার জন্য প্রয়োজন চিন্তার ঐক্য। মানুষের মধ্যে দৃশ্যত যত পার্থক্যই থাকুকনা কেন; করোটির অভ্যন্তরের, অর্থাৎ চিন্তার উৎসস্থলের সমতাই নিশ্চিত করতে পারে প্রায়োগিক সাম্যবাদ। চিন্তার উৎসস্থলের সমতা দিয়ে বৈষম্য প্রতিরোধের চর্চাকেই আমরা বলে থাকি ‘করোটির সাম্যবাদ’

নৃ-নাট্য যাত্রা শুরু করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ২০০০ সালে। ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে উঠে আসা বিভিন্ন বিভাগের কিছু তরুণ ছাত্র-ছাত্রীর সম্মিলিত প্রয়াস ছিলো সেটা। সবাই মিলে একসংগে একটা কিছু শুরু করবার তীব্র বাসনা থেকেই সেই সম্মিলন। এছাড়াও সাংস্কৃতিক ও মননশীল কর্মকান্ডশূন্য বন্ধ্যা সময়ে এর প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল তীব্রভাবেই। তার পর থেকে আজ পর্যন্ত মঞ্চায়িত হয়েছে ১৬টি নাটকের ৩১টি প্রদর্শনী। নাটক ছাড়াও নানামুখী সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও নৃ- নাট্য সব সময়ে রেখেছে অগ্রণী ভূমিকা। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ইস্যুতেও এই সংগঠনটি সর্বদা ছিল সচেতন ও সোচ্চার। শুরু থেকেই ছাত্র-ছাত্রী সদস্য ছাড়াও ক্যাম্পাসে এবং ক্যাম্পাসের বাইরে আমরা সবসময় সাথে পেয়েছি অনেক বন্ধুদের, যাদের সহায়তা ছাড়া অনেক কিছুই অসম্পূর্ন থেকে যেতো, তারা আছেন সবসময় আমাদের সংগে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত হয়ে। ২০০৪ এ সুন্দরবনের কটকা সমুদ্র সৈকতে এক মর্মান্তিক দূর্ঘটনায় এগারোটি তরুণ প্রাণ হারিয়ে যায় এবং নৃ-নাট্য হারায় তার অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং অভিনেতা, কবি, সংগঠক তৌহিদ এনাম অপুকে। পরবর্তীতে তাঁর স্মরণে প্রতিষ্ঠিত হয় তৌহিদ এনাম ফাউন্ডেশন।

কোন একক প্রচেষ্টা নয়, যূথবদ্ধ পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী নৃ- নাট্য সমস্ত প্রতিকূলতার গন্ডী ভেঙ্গে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। এই প্রয়াসের অংশীদার শুধু নৃ- কর্মীগণ নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি স্বত্তার কাছেই আমরা ঋণী।

 


অপু ভাইয়ের কবিতা


সাঁতার

জল ছুঁয়ে বলেছিল একজন,

ভাঁটায় ভেসে গেলে সমুদ্রে যাওয়া যায়।

তবু দ্বিধা কাটেনি আমার।

মাঝরাতে শীত নিয়ে গায় সম্মোহন বেদনায় দেখি

জলে ভাঙ্গা পাড়।

তুমিতো আসনি ফিরে আর-

জলের নাইওরী বেশে।

এল শুধু কচুরীর দল।

পড়শী তার জলের শুশুক,

শ্যাওলার গন্ধ নিয়ে গায়

করুণ আহ্বানে জাগায় অতল প্রলোভন।

ভেঙ্গে যায় বোধের বাঁধন।

জলের শিথানে দাঁড়িয়ে তবু

তীরবর্তী ভাষায় শুধাই হৃদয় সংলাপ,

আমি যে পারিনা সাঁতার।

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s