নৃ-বিশ্ব

. . . “নৃ” – যা নির্দেশ করে মানুষ, মানবপ্রজাতি, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-লিঙ্গ নির্বিশেষে সেই মানুষই সভ্যতার কেন্দ্র। মানবিক চিন্তা ও কর্মে এবং শিল্পের বিভিন্ন রুপে মহাবিশ্ব প্রতিফলিত হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। ‘নৃ’ সেই মানবিক কর্মযজ্ঞের অংশীদার ও করোটির সাম্যবাদে আস্থাশীল। শিল্পচর্চার পথ যাদের কাছে ঊর্ধ্বমুখী নয় বরং আপন মূলসন্ধানী। সম্বৃদ্ধ অতীত আমাদের প্রধান প্রেরণা, বর্তমান নির্মাণের আর নিরীক্ষার পটভূমি এবং ভবিষ্যত অনিশ্চিত নয় বরং অনন্ত সম্ভাবনার। . . .


‘নৃ’ যাত্রা শুরু করেছিলো ‘নৃ-নাট্য’ হিসেবে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের কিছু তরুণ ছাত্র-ছাত্রীর সম্মিলিত উদ্যোগে, ২০০০ সালে। ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে উঠে এসেছিলাম আমরা, ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং আগ্রহ। সবাই মিলে এক সঙ্গে একটা কিছু শুরু করবার তীব্র বাসনা থেকেই এই যৌথ উদ্যোগের সূচনা। অবশেষে একটা নাটকের দল করবার সিদ্ধান্ত হয়। আমাদেরই কিছু বন্ধুদের প্রবল আগ্রহ ছিলো সাহিত্য আর লেখালেখিতে, তাই তারা একটা ছোট কাগজ বের করবার প্রস্তুতি নিতে থাকে, আর এভাবেই জন্ম নেয় ছোট কাগজ ‘দ’। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোতে আমাদের এই ছাত্রদলটি নানামুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলো। নাটক মঞ্চায়ণ, ছোট কাগজ প্রকাশনা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, মানবিক সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ইস্যুতেও সর্বদা সচেতন ও সোচ্চার। শুরু থেকেই ছাত্র-ছাত্রী সদস্য ছাড়াও ক্যাম্পাসে এবং ক্যাম্পাসের বাইরে আমরা সবসময় সাথে পেয়েছি অনেক বন্ধুদের, যাদের সহায়তা ছাড়া অনেক কিছুই অসম্পূর্ন থেকে যেতো। তারা আছেন সবসময় আমাদের সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত হয়ে। ২০০৪ এ সুন্দরবনের কটকা সমুদ্র সৈকতে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় এগারোটি তরুণ প্রাণ হারিয়ে যায় এবং নৃ-নাট্য হারায় তার অন্যতম একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং অভিনেতা, কবি, সংগঠক তৌহিদ এনাম অপুকে। পরবর্তীতে উদ্যোগ নেয়া হয় ওর স্মরণে বই এবং ক্যালেন্ডার প্রকাশের।  ‘নৃ’ এখন আমাদের সকল সদস্য, সহযোগী, শুভাকাঙ্খী, যারা নৃ-নাট্য, দ এবং তৌহিদ এনাম স্মারক নানা কর্মকাণ্ডের সাথে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত, তাদের সকলের মিলনমেলা। সকলকে সাথে নিয়েই আমরা এই পথ চলতে চাই, সামনে এগিয়ে যেতে চাই, মানুষের আরো কাছে, আমাদের স্বপ্নের কাছাকাছি।


নৃ-র তাও
“The Tao that can be spoken is not the eternal Tao” – Lao Tzu

১. নৃ মুক্ত ভাবনায় বিশ্বাসী এবং ব্যক্তির মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় শ্রদ্ধাশীল। এও বিশ্বাস করে যে, মুক্তি ‘দায়িত্বহীনতা’ নয় এবং মতামত ‘গালাগালি’ নয়।

২. বিতর্ক গতিময়তা আনে ও প্রগতির অপরিহার্য অনুষঙ্গ। কিন্তু বিতর্ক ও কলহ এক জিনিস নয়।

৩. ভালোবাসা ও ঘৃণা দুই-ই অনেক শক্তি ধরে। নৃ ভালোবাসার শক্তিতে আস্থাশীল।

৪. পৃথিবীর ইতিহাস যুদ্ধের ঘটনায় পরিপূর্ণ। বর্তমান পৃথিবীতেও যুদ্ধ চলছে অনেক। আর একটি যুদ্ধক্ষেত্রের জন্ম দেয়া নৃ এর উদ্দেশ্য নয়।

৫. মেরে ফেলবার ইচ্ছে হয়তো প্রাণীর সহজাত। তবু প্রাণ নেবার বদলে প্রাণ রক্ষায় না হোক শ্রম ব্যয় করা যাক।

৬. শব্দ-বাক্য-ভাবনার ক্ষমতা অপরিসীম। তাই ক্ষমতা ব্যবহারে যত্নবান হওয়া জরুরী।

৭. সবকিছু প্রকাশ করা দুরূহ, বিশেষত গভীর সত্য,সত্যকার অনুভব, বিস্ময়, তবু প্রকাশের বাসনা প্রবল মানবের।

৮. শেষ কথা বলবার সময় তো আসে নি তাই, কথোপোকথন চলুক।

৯. কতো কি করার আছে বাকী!

Recent Posts

একজন ইলা মিত্র ও কৃষকের মুক্তি সংগ্রাম [ বর্ষ-৯, সংখ্যা-৩১]

নৃ- কল্প; থিয়েটার বিষয়ক ভাঁজপত্র প্রকাশনায় : নৃ- নাট্য, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়  প্রথম প্রকাশ : ১৩ মার্চ, ২০১২ বাংলার কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ইলা মিত্রের নেতৃত্ব, ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস কখনো ভোলার নয়। জমিদার পুত্রবধূ ইলা মিত্র তাঁর সামাজিক অবস্থানকে তুচ্ছ করে তেভাগা আন্দোলনে দরিদ্র, অসহায় কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, হয়েছিলেন অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার।ব্রিটিশ শাসনকালে বাংলার কৃষকদের উপর … Continue reading একজন ইলা মিত্র ও কৃষকের মুক্তি সংগ্রাম [ বর্ষ-৯, সংখ্যা-৩১]

মহাশ্বেতা দেবী

“মানুষ হিসেবে আমার একটা নিজস্ব বিশ্বাস আছে। সেটা আমার দেখা বৈষম্য, নির্যাতন, যুদ্ধ, ধনীদের তৈরি দুর্ভিক্ষ, নিচু বর্গের মানুষকে উচ্ছেদ এবং অবর্ণনীয় অত্যাচার—এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া আমার কাছে ধর্মবিশ্বাসের মতো। একজন লেখক হয়ে কী করে বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আমি উপেক্ষা করব, এ আমার চরিত্রে নেই। আমি যা করি তা জীবনের বাস্তব চরিত্রদের নিয়েই, ওদের গল্পই … Continue reading মহাশ্বেতা দেবী

উৎপল দত্ত স্মারক

উৎপল দত্ত “আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যেকোনো আখ্যা মানুষ আমাকে দিতে পারে তবে আমি মনে  করি আমি প্রোপাগন্ডিস্ট, এটাই আমার মূল পরিচয়।“-উৎপল দত্ত। তিনি একজন অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বামপন্থি রাজনীতিবিদ এবং মার্কসবাদী। তবে সব কিছু ছাড়িয়ে তিনি আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসে অভিনেতা, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যকার। পুরোনাম উৎপল … Continue reading উৎপল দত্ত স্মারক

রবার্ট ম্যাকনামারা: ইতিহাসের প্রায় অনুচ্চারিত এক ঘাতকের গল্প

পর্ব-১   পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কালপ্রিটগুলোর একজন রবার্ট ম্যাকনামারা। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় লোকটা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর (১৯৬১-৬৮) দায়িত্ব পালন করছিল। আঁত্কা গুলি খেয়ে মরে হিরো বনে যাওয়া কেনেডি তার প্রশাসনের সবচেয়ে দামি লোক হিসেবে বিবেচনা করতেন ম্যাকনামারাকে। মার্কিন প্রশাসন তখন নগ্ন। কালা আদমিদের দমিয়ে রাখতে জে এডগার হুভারের তত্ত্বাবধানে এফবিআই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে কোকেইন, … Continue reading রবার্ট ম্যাকনামারা: ইতিহাসের প্রায় অনুচ্চারিত এক ঘাতকের গল্প

More Posts